মনজুরুল ইসলাম

মেঘলাকাশে শুভ্র শেফালী পর্ব-৪

চার

প্রায় পনের দিন পেরিয়ে গেছে। মেঘনীল গ্রাম থেকে এখনও ফেরে নি শেফালী। কাজের চাপে ছুটি নেয়া সম্ভব হয় নি মেঘলার। কাউকে দিয়ে যে খোঁজ নেবেন সে সুযোগটিও করতে পারেন নি। নিয়ত আবেগ বিহ্বল হয়ে উঠছিলেন। পারিবারিক ব্যস্ততার ফাঁকেই চরম উৎকণ্ঠা নিয়ে বার বার করে খুঁজে ফিরছিলেন শেফালীর প্রতিবিম্বটিকে। ‘এই বুঝি আসলো শেফালী!’ কলিং বেলের শব্দ শুনেই উৎসাহ নিয়ে ছুটে যেতেন দরোজার কাছে। কিন্তু ওকে না দেখে আহত হয়ে ফিরে এসেছেন বারবার। কল্পনার জগতটি ভেঙ্গে চৌচির হয়ে গেছে। চূড়ান্ত অপেক্ষার প্রায় উপকণ্ঠে এসে দাঁড়িয়েছে মেঘলার ধৈর্য। হয়ত আর কোনোদিনই আসবে না শেফালী-এমন ভাবনার দেয়ালটিও দীর্ঘ হতে থাকলো। তবুও ক্ষীণ প্রদীপের সলতেটি নিভু নিভু করেও কোনোমতে টিকে আছে সামান্য আলো ছড়িয়ে- এমন একটি দুশ্চিন্তা খুব দ্রুত মেঘলার মননে কাজ করে চললো।

আজ তার গায়ে হলুদ। আগামীকাল বিয়ে। পুরো বাসায় বয়ে চলেছে আনন্দের ঢেউ। ধবধবে সাদা রঙের কাপড়ে নির্মিত হয়েছে বিয়ের গেট। বাসার চারিদিকে অপরূপ আলোকসজ্জা। ডিস্টেম্পার করা হয়েছে বাসাটি। ড্রইং রুমটি সাজানো হয়েছে নান্দনিক আঙ্গিকে। ড্রইংরুমের সামনের বারান্দায় ছোট্ট করে হলুদের মঞ্চ তৈরী করা হয়েছে। কাঠিযুক্ত মিষ্টি, পায়েস, ফলমূল কুলোয় সাজানো রয়েছে। পুরো মঞ্চটি হলুদ গাঁদা, হাসনাহেনা, বেলী ও রজনীগন্ধা ফুলে সাজানো। ফুলগুলির সুবাস ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। অস্বাভাবিক সু›্দর লাগছে মঞ্চটি। তারচেয়েও মোহনীয় লাগছে হলদে শাড়ী, রেশমী চুরি ও লাল টিপে সজ্জিত মেঘলাকে। মায়াবী চেহারাটি যেন আরো অধিক মাত্রায় মায়াবী হয়েছে। সেওতি, সোদালীর পাশাপাশি বেলী ফুলে মোড়ানো হাত, সিঁথিতে লাল গোলাপের মালা ও আলতা রাঙা মসৃণ পা দুটির সৌন্দর্যে মনে হচ্ছে যেন দূর নীলিমা নীল ভেদ করে রূপোর মতো চকচকে সাদা পাখা মেলে উড়ে আসা অপূর্ব এক কল্পপরী, শুভ্র আলোক রশ্মি বিকীর্ণ করছে সবার মাঝে। বান্ধবী, পড়শী, আত্মীয় স্বজন সবাই তাকে ঘিরে রয়েছে উৎসাহ নিয়ে। এই অভূতপূর্ব সৌন্দর্যরাজির মাঝেও ভেতরে ভেতরে নিষ্প্রভ মেঘলা। আড়চোখে তাকিয়ে বার বার খুঁজছেন শেফালীকে। এখনও প্রত্যাশা করছেন শেফালীর প্রত্যাবর্তন। বান্ধবী ও অল্প বয়সী স্বজনদের দুষ্টুমিও টলাতে পারছে না তাকে। চরম চূড়ায় উঠে গেছে তার নীরবতা। ‘এখনও যদি আসতো!’ এই প্রত্যাশায় বার বার মামাতো ভাইটিকে ব্যাকুলতা নিয়ে জিজ্ঞেস করছেন, ‘শেফালী আসছে?’

হলুদের দিনেও আসে নি শেফালী। আজ বিয়ে। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিজেকে স্বাভাবিক রাখবার চেষ্টা করছেন মেঘলা। বিকেলের পরই যেতে হবে শ্বশুরালয়ে। আমন্ত্রিত অতিথিদের সাথে পরিস্থিতি অনুযায়ী শুভেচ্ছা বিনিময়ের চেষ্টা করছেন। জলপ্রপাতের মতো ঝরনার মৃদু জলধারার ¯িœগ্ধ ¯্রােতের মতো ঢেউহীন এক অপূর্ব নির্ঝরিনীর মতো লাগছে তাকে। সিঁদুর লাল রঙের কারচুপির কাজ করা শাড়ী পড়েছেন। শাড়ীর সাথে সাযুজ্য রেখে শুভাকাক্সক্ষীরা সাজিয়েছে তাকে। হাত, কান ও নাকের পাশাপাশি গলার হারটিতে সৌকর্যের মাত্রাটি পেয়েছে অনন্য রূপ। খোঁপায় রজনীগন্ধা ফুলের গাজরাটি যেন উত্তীর্ণ করেছে বসন্তের আলোঝলমলে ছোট্ট নদীর উপর এসে পড়া রূপোলী সূর্যের আলোকরশ্মিকে। হলুদ গাঁদা আর লাল গোলাপ দিয়ে সাজানো বিছানায় বসে রয়েছেন। ওদিকে অতিথি আপ্যায়ন চলছে জোরে শোরে। পোলাও ও মাংসের ঘ্রাণটি ছড়িয়ে পড়ছে প্যানেলের আশপাশে। এরই মাঝে সহকর্মীদের খাবার গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। সৌজন্যতার প্রয়োজনে বিছানা ছেড়ে এসেছেন তাদের খোঁজ নিতে। তাছাড়া পুরো সময়জুড়ে বসে ছিলেন বিছানাতেই। আপ্যায়নের একেবারে শেষ দিকে মেঘনীল গ্রাম থেকে আসলেন একজন সহকর্মী। বেটে, স্থুল, শ্যামলা এবং মার্জিত। মেঘনীল গ্রামে চাকরি করতেন মেঘলার সাথে। বর্তমানে মেঘনীল গ্রামের শাখা ব্যবস্থাপক। তাকে দেখবার পরপরই শেফালীর প্রতিচ্ছবিটি ভেসে উঠলো মেঘলার কল্পলোকে। হয়ত উনিই প্রকৃত তথ্য দিতে পারবেন। কাছে গিয়ে শুভেচ্ছা বিনিময়ের পর জিজ্ঞেস করলেন-‘‘শেফালীর সঙ্গে কি আপনার দেখা হয়েছে?’’

‘শেফালী! নাতো। ওকে তো দেখি নি অনেকদিন। তবে ওর বাবাকে সেদিক দেখলাম ব্যাংক থেকে টাকা তুললেন।’’ কথাটি শুনবার পরপরই মেঘলার মুখশ্রীর ওপর একটি কৃষ্ণ ছায়া পতিত হলো। চুপসে গেলেন তিনি। আর কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না সহকর্মীকে। আমন্ত্রিত অতিথিদের আসা যাওয়া চলতে থাকলো। কৃত্রিম হাসির মাধ্যমে তাদের সাথে সদ্ভাব বজায় রাখবার চেষ্টা করলেও ভেতরে ভেতরে দেয়ালে মাথা ঠুকে রক্ত বের হবার মতো পরিস্থিতি অনুভব করতে থাকলেন মেঘলা। এরই মাঝে পাত্র পক্ষ চলে আসলো। স্বল্প সময়েই বিবাহের শুভ কাজটি সম্পন্ন হলো। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো আতিথেয়তায়। আপ্যায়নের পর্বটিও সম্পন্ন হলো। স্বাচ্ছন্দ্যে খাবার গ্রহণ করতে পারলেন না মেঘলা। শেফালীর অনুপস্থিতি কিছুতেই মেনে নিতে পারছেন না এই মুহূর্তে। সৌজন্যতার প্রয়োজনেই সামান্য খেয়ে নিলেন। খাবার টেবিলেই স্বামীকে দেখলেন। অতঃপর নির্ধারিত আসনে বসলেন। বাস্তবতা বিবেচনায় আবারও স্বাভাবিক হতে শুরু করলেন। অকৃত্রিম আচরণের মাধ্যমে পাত্রপক্ষের অতিথিদের কৌতূহলী প্রশ্নের উত্তর প্রদানের চেষ্টা করলেন। ধীরে ধীরে বিদায়ের ক্ষণটি এগিয়ে আসতে থাকলো। মেঘলাকে বিদায় জানাতে প্রস্তুত হলো সবাই।

বারান্দার মাঝখানে বিছানো টিকটিকে লাল রঙের পুরু মোলায়েম চাদরটিতে বসে আছে বর ও কনে। ধীরগতিতে ওদের কাছে আসলেন মেঘলার মা। দাঁড়িয়ে থেকেই নয়নভরে দেখলেন মেয়েকে। ফ্যাল ফ্যাল করে তাকালেন মেয়ে জামাইয়ের দিকে। ‘আমার মেঘলাকে দেখে রেখো বাবা।’ মুখ ফুটে বের হতে চাইলো কথাগুলি। সাদা গ্লাসে দুধ পান করালেন উভয়কেই। এবার বুকের ভেতর জড়িয়ে নিলেন মেঘলাকে। ধরে রাখলেন অনেকটা সময়। অবলীলায় অবিরত কাঁদতে থাকলেন দুজনই। পাশে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে মেঘলার মামী। তাকে দেখে ডান হাতটি বাড়িয়ে দিলেন মেঘলা। দুজনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকলেন তিনিও। মা, মেয়ে ও মামীর এই কান্নার দৃশ্যটি কাঁদা মাটির মতো পেলব করে তুললো সবার মনোজগতকে। সহ্য করতে না পেরে ঘরের ভেতর গেলেন মেঘলার মামা। চাপা স্বরে কাঁদতে থাকলেন। মা ও ফুপিকে মেঘলা আপুর কাছ থেকে আলাদা করবার চেষ্টা করলো আবীর। কিছুক্ষণের মধ্যে আলাদা হয়ে গেল ওরা। নিজেকে স্বাভাবিক করে ঘর থেকে বের হয়ে আসলেন মেঘলার মামা। একমাত্র ভাগ্নি ও জামাইকে দু’হাত দিয়ে ধরে এগুতে থাকলেন ধীর গতিতে। পেছন পেছন তাদের অনুসরণ করতে থাকলো সবাই।

গেটের পাশেই দাঁড় করানো ছিলো বিয়ের গাড়ীগুলি। রজনীগন্ধা ও গোলাপে সাজানো সাদা রংয়ের একটি ছোট্ট প্রাইভেট কার এবং তিনটি মাইক্রোবাস। প্রাইভেট কারটিতে উঠবেন এই মুহূর্তে মামাকে ধরে আবারও চাঁপা স্বরে কাঁদতে থাকলেন মেঘলা। চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গ-দেশ বেয়ে ঝরতে থাকলো। এরপরেও চিবুক ও গালে পড়া টোলের মোহনীয় সৌন্দর্যটি দৃশ্যমানতার বাইরে রইলো না। মামার হৃদয়খানি বরফের মতো জমাটবদ্ধ হয়ে হিমশীতল হতে থাকলো। আবীরের বন্ধুরা মিলে মেঘলা আপুকে শান্ত করবার চেষ্টা করলো। আপুর কাছ থেকে ছাড়িয়ে নিলো আবীরের বাবাকে। দৃশ্যটি প্রত্যক্ষের সাথে সাথে কান্নার শব্দটিও বাড়তে থাকলো মেঘলার। হঠাৎ একটি হাতের স্পর্শে শিউরে উঠলেন। পেছনে ফিরে তাকালেন, গভীর মনোনিবেশ সহকারে আবিস্কার করলেন তার স্বামীকে। ¯িœগ্ধতাজুড়ানো ভরাট শ্যামল মুখ। মাথায় শৈল্পিক পাগড়ি। দীর্ঘ গড়নের। আবেগমথিত চোখের দীর্ঘ পাতাগুলি ফিসফিস করে বলতে চাইছে- ‘ভালোবাসার বন্ধনে তৃণলতার মতো জড়িয়ে রাখবো তোমায়, শ্রদ্ধা করবো তোমার ব্যক্তিত্বকে।” ধীরে ধীরে কান্নার আওয়াজ হ্রাস পেলো মেঘলার। রাস্তাটি কোলাহলশূন্য হয়ে পড়েছে। রাত্রির নির্জনতায় এসেছে গভীরতার ছাপ। ঘন হয়ে এসেছে অন্ধকার। উজ্জ্বল হয়ে জ্বলছে দূর আকাশের ছোট্ট ছোট্ট তারাগুলি। প্রকৃতিও যেন এই হৃদয় মথিত করা দৃশ্যটি অবলোকনে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছে। গাড়ীতে উঠবার প্রস্তুতি নিচ্ছেন মেঘলা। গাড়ীটির বামদিকের দরোজাটি খোলা। প্রবেশের জন্য পা বাড়াবেন এমন সময় একটি চেনা কণ্ঠস্বর তীব্রভাবে আঘাত করলো তার শ্রবণকে। ফিরে তাকালেন মেঘলা। সামান্য দূর থেকে কতকটা দৌড়ে মেঘলার দিকে আসছে শেফালী। অনুসন্ধিৎসু চোখে শেফালীকে দেখে বিস্ময়াভিভূত হলেন মেঘলা। নিজেকে খুঁজে পেলেন হারিয়ে যাওয়া পথের কাক্সিক্ষত প্রান্তে। অপেক্ষার অভিমানী জানালাটি যে এভাবে খুলে যাবে ভাবতে পারেন নি কখনো। গোলাপী রংয়ের সেই নতুন জামাটি পড়ে দাঁড়িয়ে আছে শেফালী। শেফালীর আগমন তার মেঘাচ্ছন্ন আকাশে জমে থাকা কষ্টগুলিকে নির্বাপিত করে দিলো। হেমন্তের বিকেল গড়িয়ে ঠিক সন্ধ্যে হবার পূর্ব মুহূর্তে অস্তাচলগামী সূর্য যে অভাবনীয় রূপ পরিগ্রহ করে ঠিক তেমন নৈসর্গিক রূপ ধারণ করেই যেন আর একটি নতুন সূর্যের জন্ম হলো তার জীবনে। একটি শ্বেতবর্ণী পুষ্প হিসেবে শেফালী যে আবার ফিরে এসেছে তার স্বপ্নকাননে-এটি ভাবতেই রোমাঞ্চের সুখানুভূতি দ্বারা আবৃত হলেন তিনি। এবার দু’হাত বাড়িয়ে দিলেন শেফালীর দিকে। বটবৃক্ষের মতো মেঘলা আপুর মানবিক বুকের ভেতর আশ্রয় নিলো শেফালী। কিছু সময় কেটে গেল এভাবেই। আশপাশের সবার মাঝে অস্থিরতা বাড়তে থাকলো। এবার মেঘলার মুখের দিকে তাকালো শেফালী। মৃদু স্বরে বললো, “ আপু, আমার বিয়ে হয়ে গেছে।’’
‘‘কি বললি, আর একবার বল?’’

আবারও বললো শেফালী,“ আমার অনিচ্ছাতেই বাবা মা আমার বিয়ে দিয়েছেন।’’ স্তব্ধ হলেন মেঘলা। বুকের ভেতরটা ধুক ধুক করতে থাকলো। শেফালীর প্রতিটি কথাই ছুরি হয়ে আঘাত করলো তার হৃৎপি-কে। কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছেন না এই অপ্রত্যাশিত সংবাদটিকে। ভীষণভাবে ক্ষুব্ধ হলেন শেফালীর বাবার ওপর। দীর্ঘদিন ধরে সাজানো স্বপ্নটি যে এভাবে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যাবে ভাবতে পারেন নি তিনি। অজান্তেই বাঁ চোখ বেয়ে ঝরে পড়া অশ্রুর ফোঁটা মুছলেন। শেফালীর পরাজয়ের ভেতর দিয়েই তার মানসচোখে উন্মোচিত হতে থাকলো লক্ষ লক্ষ শেফালীর পরাজয়ের বিবর্ণ প্রতিচ্ছবিটি। তাহলে কি দিনের পর দিন এভাবেই শরতের পাতার মতো ঝরে পড়বে শেফালীরা, গ্রাম্য কুসংস্কার ও সুশিক্ষার অভাবে পুরু কালো চাদরে আবৃত থাকবে ওদের স্বপ্নগুলি? কোনোভাবেই কি এই বিকাশমান প্রতিভাগুলিকে উন্নতির পাদপ্রদীপে নিয়ে আসা সম্ভব হবে না! নিজেকে নিজেই এমন তীর্যক প্রশ্নে বিদ্ধ করতে থাকলেন মেঘলা। হতাশার তীব্র উপলব্ধিটি তার মানবিক শরীরকে ক্ষত বিক্ষত করতে থাকলো।

মেঘলা আপার এমন নীথর ভাব দেখে ভীষণভাবে আহত হলো শেফালী। সাহস নিয়ে আবারও বললো,“আমার স্বামীও সাথে এসেছে আপু।’’ শেফালীর পাশে তাকালেন মেঘলা। দেখতে পেলেন শেফালীর স্বামীকে। হালকা সবুজ রংয়ের শার্ট ও বাদামী রংয়ের প্যান্ট পরিহিত মিশমিশে কালো বর্ণের একটি লম্বা ছেলে। বয়স আঠারো, উনিশ হবে। মেঘলার ইঙ্গিতে তার কাছাকাছি আসলো শেফালীর স্বামী। অপরাধবোধের একটি প্রচ্ছন্ন ছায়াও বেরিয়ে আসতে চাইলো। অনেক কথা জমে আছে- বোঝা গেল তার চাহনিতে। এবার কথা বলতে শুরু করলো। ‘আপা, শেফালীর কাছ থেকে আমি সব শুনেছি। পড়াশুনায় আমি নিজেও ভালো ছিলাম। শুধুমাত্র অর্থের অভাবেই পড়াশুনা ছেড়ে ইলেকট্রিক মিস্ত্রির কাজ করছি। অল্পবয়সী মেয়েকে বিয়ে করার কোনো ইচ্ছেই ছিল না আমার। পারিবারিক ও সামাজিক চাপে বাধ্য হলেও কাপুরুষের মতো যৌতুক গ্রহণ করি নি। তবে আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি-এমন কিছু করবো না যাতে ওর পড়াশুনার ব্যাঘাত ঘটে। আমি ওকে পড়াতে চাই আপা, আমার দু’হাতের উপার্জিত অর্থ দিয়ে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে চাই, ওকে নিয়ে আপনার যে স্বপ্ন সেটি অবশ্যই আমাদের পূরণ করতে হবে।’ কথাগুলি শুনবার পর দুজনের দিকে নিবিড়ভাবে তাকালেন মেঘলা। কিন্তু কোনো কথাই বলতে পারলেন না। বলা সম্ভবও হলো না তার পক্ষে। এখনও তার পাশে গা ঘেষে দাঁড়িয়ে আছে শেফালী। মেহেদী রাঙা হাতের মধ্যে পুরে নিলেন শেফালীর হাতখানি। সেই বিশ্বস্ত হাতের ছোঁয়ায় আবেগাপ্লুত হলো শেফালী। এবার দু’হাতের অঞ্জলি শেফালীর মাথার দু’পাশে রেখে কপালে একটি চুমু দিলেন মেঘলা। ইতোমধ্যে শিথিল হয়ে এসেছে ওদের আলিঙ্গন। দেরী করা সমীচীন হবে না ভেবে গাড়ীতে উঠলেন মেঘলা। মুহূর্তেই স্টার্ট হলো গাড়ী। ঘুরতে শুরু করলো গাড়ীর চাকা। শেফালীর দিকে ফিরে তাকাতে পারলেন না মেঘলা। স্থির দাঁড়িয়ে আছে শেফালী। দু’চোখ ভরা অশ্রুর বন্যা। অসহনীয় ব্যথার ভার নিয়েই ডান হাতটি উপরে তুলে নাড়তে থাকলো মেঘলা আপুর উদ্দেশ্যে।

magnifiercrossmenu