মুখোশ
১
সাদা-কালো চুল ও দাড়িতে নিয়মিত মেহেদি লাগাতেন আবু আছির মিয়া। প্রতি বৃহস্পতিবার খদ্দরের ইস্ত্রি করা পাঞ্জাবি পরে দ্বীন প্রচারে বিভিন্ন মসজিদে ঘুরতেন। যখন হাঁটতেন, তখন মনে হতো বাতাস যেন আগে থেকেই রাস্তা পরিষ্কার করে রেখেছে। মুখের কোণে লেগে থাকা সেই মৃদু হাসি—একখণ্ড মিষ্টত্ব, যা দেখলে মানুষ ভাবে, পৃথিবীতে হয়তো এখনও অলি-আওলিয়া জীবিত আছেন। আবু আছির সাহেবের গায়ের দামি সুরমা আর আতরের গন্ধে মহল্লার গলিগুলোতে মুহূর্তের জন্য যেন জান্নাতের সুবাস ছড়িয়ে পড়ত।
পথ চলতে গিয়ে কেউ সালাম দিলে তিনি অতি বিনয়ের সাথে দুই হাত বুকের কাছে এনে, মাথাটি সামান্য নুয়ে বলতেন,
-ওয়া আলাইকুমুস সালাম, বাবা।
ভালো আছ তো?
মহান আল্লাহ তোমাকে ভালো রাখুন। দুনিয়া তো দু দিনের, একটু ইবাদত-বন্দেগি করো।”
কথাগুলোর ভেতরে কোনো খাদ পাওয়া যেত না। মুখে সবসময় আল্লাহ-রসূলের নাম থাকতোই। ঠোঁট দুটো যখন নড়ত, তখন মনে হতো যেন কোনো ঋষি বাক্য উচ্চারণ করছেন। সমাজসেবা, গ্রামের শালিস-বিচার কিংবা বার্ষিক দ্বীনি মাহফিল—সব জায়গাতেই তাঁর আসন নির্ধারিত ছিল একেবারে সামনের সারিতে। মাইক হাতে পেলেই তিনি বলতেন-
ঈমান হলো মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। হারাম উপার্জন যে করে, তার দোয়া আসমান পর্যন্ত পৌঁছায় না।
অথচ এই ধবধবে সাদা পোশাক আর সুমিষ্ট বচনের নিচে যে বিষাক্ত কালসাপের ফণা লুকিয়ে ছিল, তার আঁচ কেবল পেতেন তাঁর সহকর্মীরা। কিন্তু তাঁরাও তো বাধ্য। কারণ ক্ষমতার যে অদৃশ্য শিকল দিয়ে তিনি চারপাশ পেঁচিয়ে রেখেছিলেন, তাকে টপকানো সাধারণ মানুষের কাজ ছিল না।
আবু আছির সাহেবের শিক্ষার ইতিহাসটা ছিল বেশ কুয়াশাচ্ছন্ন। বিজ্ঞান বিভাগের এক বিষয়ে অনার্সে কোনোমতে ‘তৃতীয় শ্রেণি’ পেয়ে পাস করেছিলেন। শিক্ষাগত যোগ্যতার খাতা দেখলে বোঝা যেত—তিনি পাসের সীমানা পার হয়েছিলেন কেবল খাতায় কলম ছোঁয়ানোর জোরে। কিন্তু জালিয়াতি, ফাইলে টাকা গুঁজে দেওয়া আর টেবিলের তলার লেনদেনে তাঁর মেধা ছিল অসাধারণ। সেখানে তিনি কোনোদিন দ্বিতীয় হননি, সবসময় ছিলেন ‘ফার্স্ট ক্লাস’।
২
কর্মজীবনের শুরুতে তিনি ঘুরেছেন হাতব্যাগ নিয়ে—ওষুধ কোম্পানির রিপ্রেজেন্টেটিভ হয়ে। কিন্তু সেখানে মন টেকেনি। দৌড়ঝাঁপ বড্ড বেশি। হুট করেই একদিন খোলস বদলে ফেললেন। এক দরবারের মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিলেন। দাড়ি আর পাঞ্জাবির আড়ালে নিজেকে ঢাকলেন অতি সূক্ষ্মভাবে। কিন্তু নজর ছিল উঁচুতে। নজর পড়ল এলাকার সদ্য গড়ে ওঠা কলেজটার দিকে।
পদের নাম, অধ্যক্ষ।
নিয়োগ পরীক্ষা হলো। যোগ্যতার লড়াইয়ে বিজ্ঞান নিয়ে কোনোমতে থার্ড ক্লাস পাওয়া আবু আছির পেছনে পড়ে রইলেন তৃতীয় স্থানে। মেধা আর ভাইভার নম্বর বিচারে তিনি পিছনের সারির লোক। কিন্তু যে লোক টাকা আর প্রভাবের সমীকরণ জানে, তাকে কি আর মেধা দিয়ে আটকে রাখা যায়? তৎকালীন পরিচালনা পর্ষদের এক প্রভাবশালী সদস্যের সঙ্গে এক শীত সন্ধ্যায় তিনি গোপনে বসলেন। বন্ধ ঘরের ভেতর এক লাখ, দুই লাখ করে নোটের থাক সাজানো হলো। দরদাম চলল দরজায় খিল এঁটে।
পরদিন সকালে এক জাদুকরী নোটে হিসাব বদলে গেল। পেছনের সারির আবু আছির তালিকার এক নম্বরে উঠে এলেন। ভাইভার নম্বর রাতারাতি পাল্টে গেল, জালিয়াতির চাদরে ঢাকা পড়ে গেল সততা। চরম ধূর্ততায় তিনি এসে বসলেন অধ্যক্ষের ওই গদিআঁটা চেয়ারটিতে।
তারপর কেটে গেল দীর্ঘ ষোলোটি বছর।
এই ষোলো বছরে কলেজের ইটের দেওয়ালগুলো ধূসর হয়েছে, চুনকাম খসে পড়েছে, কিন্তু আবু আছির সাহেবের পাঞ্জাবির ধবধবে ভাব এতটুকু কমেনি। এটি কলেজের জন্য কোনো উন্নয়নমূলক কাজ ছিল না; ছিল এক নিরবচ্ছিন্ন, ঠান্ডা মাথার লুণ্ঠন। কলেজটিকে তিনি মনে করতেন বাব-দাদার তালুকি।
৩
একদিন কলেজের স্টাফ রুমে জানালার পাশে বসে প্রবীণ শিক্ষক আজহার সাহেব চা খাচ্ছিলেন। লিকারের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে পাশের তরুণ প্রভাষক রফিককে¬ বললেন¬-
রফিক সাহেব, একটা কথা ভেবে দেখেছন? অনার্সে বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে থার্ড ক্লাস পাওয়া লোকটা আজ আমাদের অভিভাবক! আমাদের মাথার ওপর বসে আছে। এটাকে কী বলবে আপনি?
রফিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে টেবিলের খাতাটা বন্ধ করল। সে তিতা কণ্ঠে বলল-
শিক্ষাগত যোগ্যতায় হয়তো উনি থার্ড ক্লাস, আজহার স্যার; কিন্তু দুর্নীতির স্কেলে তো উনি ডাবল ফার্স্ট ক্লাস! তা না হলে ভাইভায় থার্ড হয়েও ফার্স্ট পজিশন কেনে কীভাবে? যোগ্যতা যার ঝুলিতে নাই, সে তো অন্য উপায়েই ঝুল ভর্তি করবে।
এলাকার বাতাস জুড়েই স্বজনপ্রীতি আর ঘুষের গন্ধ। মেধার কোনো দাম নেই। মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে তিনি অযোগ্যদের অবৈধভাবে শিক্ষক বানাতে লাগলেন। শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিলেন স্ত্রীর ভাই, ভাইয়ের বৌকে। অথচ সরকারিভাবে যে শিক্ষকগণ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এসেছেন তাদেরকে নানাভাবে হয়রানি করেছেন বছরের পর বছর। নানা অযুহাত দেখিয়েছে এমপিও ফাইল সই করতে; দেখিয়েছেন রাজনীতির ভয়। সে শিক্ষকগণের অশ্রু এখনো তাকে অভিশাপ দেয়।
কলেজের লাইব্রেরি ফান্ড ফাঁকা, ছাত্রকল্যাণ ফান্ডের কোনো পাত্তা নেই, অভিভাবক সমাবেশ, বিজয় দিবস, নবীনবরণ পালন, কম্পিউটার ক্রয় ইত্যাদি খাতা-কলমে বড় বড় প্রজেক্টের ভুয়া ভাউচার তৈরি করেছেন প্রতিনিয়ত।
একদিন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রমিজ সাহেব তাঁর এমপিও ফাইল আর বার্ষিক প্রমোশনের কাগজপত্র হাতে নিয়ে অধ্যক্ষের সুসজ্জিত কক্ষে ঢুকলেন।
-স্যার, আস সালামু আলাইকুম স্যার, স্যার, ভেতরে আসব? রমিজ সাহেবের গলায় কিছুটা মিনতি।
আবু আছির সাহেব বিল-ভাউচারে ওপর কলমটি নামিয়ে রাখলেন। অতি মিষ্টি হেসে বললেন-
আসুন, রমিজ সাহেব, বসুন। চা খাবেন?
না স্যার, চা থাক। বলছিলাম... আমার এমপিও ফাইলটা তো বহুদিন ধরে আটকে আছে। প্রমোশনের সময়ও পার হয়ে যাচ্ছে। কাগজগুলো একটু সই করে দিলে বড় উপকার হতো। পাঁচ সদস্যের পরিবার তাছাড়া ছেলেদের লেখাপড়ার খরচ নিয়ে বড় কষ্টে আছি।
আবু আছির সাহেব কলমটি টেবিলের ওপর থেকে আবার হাতে তুলে নিলেন। আঙুলে হাত ঘষতে ঘষতে এক চিলতে বিষাক্ত হাসি উপহার দিলেন।
-আরে রমিজ সাহেব, আপনি তো পুরানো মানুষ! শুধু কাগজ আনলেই কি কাজ হয় বলুন? কলেজের কত খাত, কত অদেখা খরচ! হাত খালি রাখলে কি আর খাতা সই হয়? বোবা হয়ে থাকলে তো পেট ভরবে না। বোঝেনই তো—গিভ অ্যান্ড টেক! দুনিয়াটা তো লেনদেনেরই জায়গা।
রমিজ সাহেব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন।
-স্যার, কিন্তু এটা তো আমার ন্যায্য অধিকার! ষোলো বছর ধরে রক্ত জল করে পড়াচ্ছি...
অধিকার?
আবু আছির সাহেবের গলায় সামান্য ধার চলে এলো, তবে হাসিটা বিলুপ্ত হলো না।
-অধিকার তো আসমানে থাকে রমিজ সাহেব, জমিনে থাকে নিয়ম। আর নিয়ম বানাই আমরা। চিন্তা করে দেখুন, ছয় লাখ টাকা কি খুব বেশি? আপনার ফাইলের ওজন বাড়াতে হলে কিছু তো খরচ করতেই হবে।
রমিজ সাহেব মাথা নিচু করে বের হয়ে এলেন। এই রক্তচোষা নীতিতেই চলছিল সব। উন্নয়ন ফান্ড, ছাত্রকল্যাণ ফান্ড, লাইব্রেরি ফান্ড এমন কি কলেজের ফিক্স ডিপোজিট—কোথাও টাকা জমা থাকত না। সব গিয়ে উঠত তাঁর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে। যে শিক্ষকেরা প্রতিবাদ করতে যেতেন, তাঁদের কপালে জুটত ভুয়া অভিযোগে শোকজ নোটিশ অথবা অধ্যক্ষের কক্ষে ডেকে দেওয়া হত হুমকী।
এক দিন মনিরুল নামক এক শিক্ষক তার ক্ষোভ সহকর্মীদের কাছে প্রকাশ করলেন। কারণ তাকে আবু আছির নানা অজুহাত দেখিয়ে অন্যায়ভাবে ১৮ মাসে এমপিওর ফাইল আটকিয়ে রেখে ছিলেন এবং টাকার বিনিময়ে তার ফাইল সই করেছিলেন।শিক্ষকদের আড্ডায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মনিরুল সাহেব বলেই ফেললেন-
তাকে এতদিন ভাবতাম কুত্তার বাচ্চা, এখন দেখি সে আসলে শুয়ারের বাচ্চা। লেবাস পরে হেন অপকর্ম নেই যা সে করে না। অথচ মুখে ধর্মের বাণী শোনায়।
৪
দুর্নীতি আবু আছিরের একার অভ্যাস ছিল না, এ অভ্যাস তাঁদের বংশানুক্রমিক ব্যাধি। তাঁর ছোট ভাই আমিনুলও এক মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হয়ে ফান্ড তছরুপের দায়ে জেল খেটেছিলেন। ভাইকে জামিনে মুক্ত করা এবং বরখাস্তের পর প্রভাব খাটিয়ে অন্য স্কুলেও চাকরি পাইয়ে দেওয়ার লেনদেনে আবু আছিরকে মোটা অঙ্কের টাকা পানিতে ফেলতে হয়েছিল।
কুকুরের লেজ কখনো সোজা হয় না। অভ্যাসের দাস আমিনুল সেখানেও ভবনের ফান্ড তছরুপ করে ফের চাকরি হারাল। গেলেন জেলে। জেল থেকে বেরিয়ে একদিন অন্ধকার সন্ধ্যায় আমিনুল এল আবু আছিরের বাড়ির পাশের মসজিদে।
-ভাই, আমার চাকরিটা তো গেল। স্কুল কমিটি তো আমাকে বরখাস্ত করেছে। আবু আছির ধমকে উঠলেন-
তোর লোভটা একটু কম হলে আজ এই দিন দেখতে হতো না! খাবি খা, গিলে খাস কেন? আমি টাকা দিয়ে তোকে জেল থেকে বের করলাম। এবার মুখ বন্ধ রাখবি; কৌশলে খাবি।
-কিন্তু আমার তো সংসার চালাতে হবে ভাই। আমাকে আরেকটা ব্যবস্থা করে দাও।
ভাইয়ের এই লাগামহীন অপকর্ম সামলাতে ও হিসাব ঢাকা দিতে গিয়ে আবু আছির সাহেব নিজেও ঋণের মহাজালে আটকে পড়লেন।
বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংক আর একাধিক এনজিও থেকে নেওয়া কোটি টাকার ঋণের কিস্তির তাগাদায় রিকভারি অফিসাররা যখন সকালে তাঁর বাড়ি ও কলেজের গেইটে এসে দাঁড়াত, তখন সাদা পাঞ্জাবির আড়ালে প্রথম দুশ্চিন্তার ভাঁজ ফুটে উঠত।
ঋণের বোঝা মেটাতে তিনি বেছে নিলেন চূড়ান্ত পাপের পথ। ব্যাকডেটে এগারো বছর আগের এক শূন্য পদে ‘লিজা’ নামের এক ধনী পরিবারের মেয়কে প্রভাষক হিসেবে অবৈধ নিয়োগ দিলেন—টাকার পরিমান নগদ পঁচিশ লাখ।
কিন্তু আবু আছির যে ফাঁদ পেতেছিলেন, সেখানেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছিল কালবৈশাখী ঝড়। ব্যাকডেটে যে শিক্ষকের অবসরকালীন পদে লিজাকে দেখানো হয়েছিল, তিনি আগে থেকেই মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ করে রেখেছিলেন। খবর পেয়ে শিক্ষা বোর্ড ও সরকারি উচ্চপর্যায়ের দপ্তর থেকে হুট করেই এক কড়া তদন্ত কমিটি কলেজে এসে হাজির হলো।
তদন্তের দিন কলেজের অধ্যক্ষের কক্ষে থমথমে পরিবেশ। তদন্তকারী জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রহমান সাহেব ফাইলগুলো একে একে টেবিলের ওপর ছুঁড়ে ফেলছিলেন।
আবু আছির সাহেব, রহমান সাহেবের কণ্ঠস্বর গম্ভীর-
আপনার ভাইভার স্কোর আর অডিট রিপোর্ট তো বলছে ষোলো বছর আগে এই পদে আপনার নিয়োগটাই সম্পূর্ণ অবৈধ ছিল! অনার্সে থার্ড ক্লাস পেয়ে আপনি ভাইভায় ফার্স্ট হলেন কীভাবে? আপনি ২১ মাসে প্রায় কুড়ি লক্ষ টাকা প্রতিষ্ঠানের ফান্ড তছরুপ করেছেন। আর ব্যাকডেটে লিজাকে টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার পর তাঁর ভাই আমাদের কাছে সব স্বীকার করে গেছেন! এবং এটাও বলেছে যে তাদের সাথে আপনি প্রতারণা করেছেন।
আবু আছির সাহেবের চিবুক কাঁপতে লাগল। কপালে ঘামের চটচটে ফোঁটা। অতি কষ্টে তোতলাতে তোতলাতে বললেন- স্যার... মানে... অডিটে হয়তো ভুল হয়েছে... আমি তো এক টাকাও দুর্নীতি করিনি একটা মহল আমার রিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে...
-থামান আপনার এই ভণ্ডামি!
রহমান সাহেব কড়া গলায় বললেন।
-কাল সকালে সমস্ত আসল ভাউচার, রেজিস্টার, ক্যাশবুক, ডেইলিবুক আর স্টেটমেন্ট নিয়ে প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত হবেন। এক চুল হেরফের হলে সোজা পুলিশ কেস।
বিকেলে তদন্ত দল চলে যাওয়ার পর পুরো কলেজ ক্যাম্পাসে এক নিস্তব্ধ নীরবতা নেমে এলো।
আবু আছির সাহেব নিজের খাস কামরার দামী চামড়ার চেয়ারটায় ধপাস করে বসে পড়লেন। ঘরের শীতল এসিটা যেন হঠাৎ করেই বিষাক্ত বাষ্প ছড়াতে শুরু করেছে। যে কাঁচের টেবিলটায় বসে ষোলো বছর ধরে সহকর্মীদের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছেন, সেই টেবিলে এখন নিজেরই প্রতিবিম্ব ভেসে উঠছে—বিভৎস, কদাকার আর অসহায়। নিজের চেহারাকে আর এখনো মানুষের চেহারার মতো মনে হয় না।
৫
তিনি উঠে দাঁড়ালেন। হাত কাঁপছিল। ব্লাডপ্রেশার বেড়ে গেছে। পকেট থেকে ড্রয়ারের চাবি বের করতে গিয়ে চাবিটা হাত থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেল। হাঁটু গেড়ে বসে চাবিটা কুড়াতে গিয়ে তাঁর মনে হলো—
ঈমান ও হালাল উপার্জনের যে বুলি তিনি মসজিদে মসজিদে আওড়াতেন, তা যেন প্রতিধ্বনি হয়ে ঘরের চার দেওয়ালে আছড়ে পড়ছে।
গাড়ি স্টার্ট দিয়ে যখন তিনি বাড়ির দিকে রওনা হলেন, তখন বিকেলের আলো মরে আসছে। ঘরে ফিরে তিনি কাউকে কিছু বললেন না। রাতের অন্ধকারে, পরিবারের স্ত্রী ছোট ছেলে-মেয়ে সবাইকে ঘুমন্ত রেখে তিনি ড্রয়ার থেকে জমানো কিছু নগদ টাকা আর পান্জাবী-পাজামা একটা ছোট ব্যাগে পুরলেন।
ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই নিজের চেহারাটা দেখে শিউরে উঠলেন তিনি। আয়নার মানুষটার চুল-দাড়িতে মেহেদির রং চটে গিয়ে এক অদ্ভুত মেটে রূপ নিয়েছে। বয়সটা যেন একদিনের ব্যাবধানে বিশ বছর বেড়ে গেছে। তিনি পাঞ্জাবিটা খুলে একপাশে ছুঁড়ে ফেললেন। ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি ছাড়া নিজের নগ্ন শরীরটাকে তাঁর মনে হলো এক দাগী আসামির থলথলে চামড়া। আলনা থেকে একটা সাধারণ, মলিন শার্ট গায়ে চাপিয়ে, দাড়ি ঢেকে দেওয়ার জন্য একটা কালো মাফলার মুখে জড়িয়ে তিনি পেছনের দরজা দিয়ে অন্ধকারের ভেতর মিলিয়ে গেলেন।
পরদিন সকালে কলেজে আর আবু আছির সাহেবের দেখা মিলল না। অধ্যক্ষের কলমটি টেবিলের ওপর তেমনি পড়ে রইল, কেবল মানুষটা হাওয়া।
পরের কয়েকদিন খবরের কাগজে খবর এল—আবু আছির এবং তাঁর ভাই দুজনেই পলাতক। ব্যাংক ও এনজিওর ঋণের নোটিশ দরজায় ঝুলছে, পুলিশ তাঁদের খুঁজছে জালিয়াতি ও রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের মামলায়।
৬
কয়েক মাস পরের কথা।
সীমান্তবর্তী এক প্রত্যন্ত গাঁয়ের ছোট বাজারে আছরের আজানের পর এক বৃদ্ধ লোককে হেঁটে যেতে দেখা গেল। গায়ের শার্টটা ধুলোবালি মাখা, মুখের দাড়িগুলো উসকোখুসকো, মেহেদির কোনো চিহ্ন নেই। হাঁটছেন অতি সন্তর্পণে, যেন মাটির নিচে কোনো ডাইনামাইট পোঁতা আছে।
হঠাৎ বাজার মোড়ে কলেজের সেই ভুক্তভোগী জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রমিজ সাহেবের সাথে লোকটার মুখোমুখি দেখা হয়ে গেল। রমিজ সাহেব এক বিশেষ কাজে ওই এলাকায় এসেছিলেন।
আবু আছির থমকে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখ দুটোতে এক অসীম আতঙ্ক। অভ্যাস বশত কি না কে জানে, তিনি অতি দ্রুত দুই হাত বুকের কাছে এনে মাথাটা একটু নুয়ে বিড়বিড় করে বললেন-
ওয়া আলাইকুমুস সালাম,... আপনি ভালো আছেন তো?
অথচ রমিজ সাহেব তাঁকে কোনো সালাম দেননি!
রমিজ সাহেব কিছুক্ষণ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। তারপর মুখ থেকে এক চিলতে করুণা ও তীব্র ঘৃণার হাসি ছড়িয়ে বলল- সালাম তো দিইনি, আবু আছির সাহেব! সালাম তো দিতাম ওই ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি আর সুরমার সুবাসকে। ভেতরে যে বিষাক্ত মানুষটা ছিল, তাকে চেনার পর আর কোনো সালাম বাকি থাকে না।
আবু আছির সাহেব কোনো উত্তর দিতে পারলেন না। কাঁপতে কাঁপতে মুখের মাফলারটা টেনে নিয়ে ভিড়ের ভেতর মিশে যেতে লাগলেন।
রমিজ সাহেব দূর থেকে সেই পালিয়ে যাওয়া অবয়বের দিকে তাকিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছেলেটাকে অস্ফুটে স্বরে বললেন—দ্যাখো, ওই লোকটাকে চেনো? শিক্ষায় যে লোক থার্ড ক্লাস ছিল, আজ নিজের আর পরিবারের পাপের বোঝা বইতে বইতে জীবনের খাতাতে সে ডাবল ফার্স্ট ক্লাস নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছে! মিথ্যা মুখোশ পরে ভেতরের দানবটাকে কি চিরকাল ঢেকে রাখা যায়? পাপের ষোলকলা পূর্ণ হলে মুখোশ একদিন এমনিতেই খুলে যায়।
(নোট: অডিট থেকে বাঁচতে সে, যে সহকর্মীর সাথে অন্যায় অবিচার করেছেন তাদের বাড়ি বাড়ি গেছেন ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু তার সহকর্মীরা কেউ তাকে বিশ্বাস করেনি। ততদিনে সহকর্মীগণ তাকে চিনে গেছেন একজন মুখোশধারী মানুষ হিসেবে।)
খাইরুল ইসলাম
শিক্ষক ও সাংবাদিক
মন্তব্য (০)
এখনও কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মূল্যবান মতামত জানান।
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এই লেখাটিতে মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ করার জন্য আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন থাকা আবশ্যক।