অনুসন্ধান করুন

বুক রিভিউ: প্রদোষে প্রাকৃতজন

পড়ার সুবিধা
হরফের আকার:

বুক রিভিউ


বইয়ের নাম: প্রদোষে প্রাকৃতজন

প্রকাশক: ইউপিএল (ইউনিভার্সটিি প্রেস লিমিটেড)

প্রকাশকাল: ১৯৮৪, অষ্টাদশ মুদ্রণ: মার্চ ২০২৪

মূল্য: ৩৪০/-

লেখক: শওকত আলী

রিভিউকার: খাইরুল ইসলাম


"যদি কোনো পল্লী বালিকার হাতে কখনো মৃৎপুত্তলী দেখতে পান, তাহলে লেখকের অনুরোধ, লক্ষ্য করে দেখবেন, ঐ পুত্তলীতে লীলাবতীকে পাওয়া যায় কি না— আর যদি যায়, তাহলে বুঝবেন, ওটি শুধু মৃৎপুত্তলীই নয়, বহু শতাব্দী পূর্বের শ্যামাঙ্গ নামক এক হতভাগ্য মৃৎশিল্পীর মূর্ত ভালোবাসাও।"

— শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’

বাংলাদেশের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শক্তিমান ও প্রাজ্ঞ ঔপন্যাসিক শওকত আলী। নির্দ্বিধায় এবং বিনয়ের সঙ্গে বলতে হয়—যে পাঠক তাঁর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ বইটি পড়েননি, তিনি বাংলা সাহিত্যের শেকড় এবং গভীরতম স্রোত থেকে নিজেকে বঞ্চিত রেখেছেন।

কাহিনী বিন্যাস ও পটভূমি

উপন্যাসের ভৌগোলিক ক্যানভাস জুড়ে রয়েছে প্রাচীন বাংলার চেনা ও অচেনা জনপদের নাম:

গ্রাম: আম্রপট্টলী, বিল্বগ্রাম, কদম্বঘাট, ফল্গুগ্রাম, নবপাঠক, উদয়পুর, মদনপুর, মঙ্গলদ্বীপ, পলাশবাটি ইত্যাদি।

শহর: দেবীকোট, উজবট, পিপ্পলীহাট, পুণ্ড্রনগর ইত্যাদি।

নদী: আত্রাই, পুনর্ভবা, করতোয়া।


প্রধান চরিত্রসমূহ: নারী চরিত্র—মায়াবতী, লীলাবতী; পুরুষ চরিত্র—বসন্তদাস, শ্যামাঙ্গদাস, অভিমন্যুদাস, হরিসেন।

তুর্কি আক্রমণ ও সেন রাজাদের শেষ আমলের পটভূমিতে রচিত হয়েছে এই ঐতিহাসিক উপন্যাস। সে যুগে সেন রাজাদের রাজত্বে সাধারণ মানুষ সামন্ত মহাসামন্তদের চরম অত্যাচারে জর্জরিত ছিল। সেই নিপীড়নের বিরুদ্ধে কখনো প্রতিবাদী হয়ে উঠতেন অন্ত্যজ হিন্দুরা, কখনো বা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা। এই উপন্যাসের ক্যানভাসজুড়ে রয়েছে কয়েকজন প্রাকৃতজনের জীবন-সংগ্রামের নিখুঁত চিত্র:

আত্রেয়ী নদীর তীরের মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ, যার মনে একটাই প্রশ্ন—কেন তার গুরু বসুদেব তার প্রতি এতটা রাগান্বিত?

মায়াবতী, যে তার স্বামী বসন্তদাসকে বাহুডোরে আগলে রাখতে চায়, কিন্তু কোন অমোঘ টানে সে ছুটে যায় মিত্রানন্দের কাছে?

স্বামী পরিত্যক্তা লীলাবতী, যে কি শেষ পর্যন্ত ফিরে পাবে তার স্বামী অভিমন্যু দাসকে?

সামন্ততান্ত্রিক শোষণের নাগপাশ থেকে অন্ত্যজ মানুষ বা বৌদ্ধ ভিক্ষুরা কি শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পেরেছিল দেশকে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর আর মানবীয় আবেগের জটাজাল নিয়েই এগিয়ে গেছে উপন্যাসের গল্প।

নামকরণ ও সময়ের প্রেক্ষাপট

‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ নামটির তাৎপর্য গভীরভাবে অনুধাবনযোগ্য। ‘প্রাকৃতজন’ অর্থ এ ভূখণ্ডের মূল সাধারণ অধিবাসী। সেনবংশের রাজত্ব তখন পতনের মুখে, কিন্তু ছোট-বড় জমিদারদের নিষ্ঠুর অত্যাচার একটুও কমেনি।

সে এমন এক যুগ, যেখানে মন্দিরের পবিত্রতা রক্ষায় সকালে পশ্চিম দিকের এবং বিকেলে পূর্ব দিকের রাস্তা বন্ধ করে রাখা হতো—যাতে নিচু জাতের মানুষের ছায়া মন্দিরে না পড়ে! দরিদ্র চাষীদের ওপর চলত অকথ্য নির্যাতন। সহ্যসীমা ছাড়িয়ে গেলে মাঝে মাঝেই এই ‘নিচু জাতের’ মানুষেরাও বিদ্রোহের আগুন জ্বেলে উঠতেন। ঠিক তখনই তুর্কিস্তান থেকে বখতিয়ার খিলজির বাহিনীর পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে এবং বনিকেরা আসছে নতুন বার্তা নিয়ে।

আর ‘প্রদোষ’ অর্থ সন্ধ্যা বা গোধূলি লগ্ন—অর্থাৎ দিন ও রাতের সন্ধিক্ষণ, এক যুগের অবসান ঘটিয়ে অন্য যুগের সূচনার সময়। ইতিহাসের সেই ক্রান্তিলগ্নে সাধারণ মানুষ কীভাবে বেঁচে ছিল, কেমন ছিল তাদের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা ও দৈনন্দিন জীবন—তারই এক অনবদ্য দলিল এই উপন্যাস।

লেখকের প্রেরণা: ইতিহাসের এক অনন্য সংযোগ

এই উপন্যাস রচনার পেছনের প্রেক্ষাপটটিও বেশ রোমাঞ্চকর। সেন বংশের শেষ রাজা লক্ষণ সেনের সভাকবি ছিলেন হলায়ূধ মিশ্র। তিনি সংস্কৃত ভাষায় ‘শেক শুভদয়া’ নামে একটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন (যেখানে ‘শেক’ অর্থ ‘শেখ’ বা মুসলমান, এবং এ দেশে মুসলমানদের ‘শুভ উদয়’ বোঝাতেই এই নামকরণ)।

শওকত আলী যখন সেই বইটির কিছু অংশ পড়েন, তখন এক জায়গায় দেখেন—বণিকেরা নৌকায় করে অশ্ব বিক্রি করতে এসেছে। সন্ধ্যাবেলা অশ্ব বিক্রি শেষে দেখা গেল, দলের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তি নন, বরং একজন ভৃত্য পশ্চিম দিকে মুখ করে প্রার্থনা করছেন এবং দলনেতাসহ সবাই তার পেছনে দাঁড়িয়ে সেই ভৃত্যকে অনুসরণ করছেন! প্রার্থনা শেষে তারা সবাই একসঙ্গে বসে আহার করছেন।

জাতপাতহীন এই সাম্যবাদী আচরণ তৎকালীন সমাজে ছিল অভূতপূর্ব। তা ছাড়া সে সময়ে বৌদ্ধদের সমাজেও এমন সাম্যব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। এই ঐতিহাসিক বিবরণীই শওকত আলীকে প্ররোচিত করেছিল এক মহাকাব্যিক উপন্যাস রচনা করতে।


চরিত্র, ভাষা ও জীবনদর্শন

কিছু চরিত্র পাঠকের বুকের ভেতর চিরকালের জন্য গেঁথে যায়। ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’-এর লীলাবতী তেমনি একটি অবিস্মরণীয় চরিত্র। মৃৎশিল্পী শ্যামাঙ্গ এবং লীলাবতীর প্রেমকে কেন্দ্র করে আবর্তিত গল্পের সঙ্গে মিশে আছে সেই সময়ের আলোড়ন সৃষ্টিকারী সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ।

উপন্যাসটির ভাষা অত্যন্ত মননশীল ও ক্লাসিকধর্মী। যারা খুব হালকা বা চটুল বই পড়তে অভ্যস্ত, তাদের কাছে এর ভাষা কিছুটা কঠিন মনে হতে পারে। যেমন—

"আরো কিছুক্ষণ হাঁটবার পর অতিশয় ক্লান্তি বোধ হয়। অবশেষে শ্যামাঙ্গ একটি বটবৃক্ষের নিচে মৃত্তিকা বেদীতে প্রথমে উপবিষ্ট ও পরে অর্ধশয়ান হলো। তাঁর সন্দেহ হতে লাগল নবগ্রাম হাট নিশ্চয়ই দূরে।"

অথবা—

"ঐ কথার পর আহারে মনো মনোযোগী হতে হলো। তবে প্রশ্নটি না তুলে পারলো না শ্যামাঙ্গ। দীনদাসের মুখপানে দৃষ্টি রেখে জানতে চাইলো, ভিক্ষুদের সংখ্যাবৃদ্ধির কি কোনো তাৎপর্য আছে বলে বোধ হয় আপনার? দীনদাস তখন মুখ গহ্বরে মৎসপেটিকার তৈলাক্ত অংশটি নিয়ে ওষ্ঠদ্বয় সংবদ্ধ করে দক্ষিণ হস্তে কন্টকগুচ্ছ টানতে ব্যস্ত। তিনি ঐ অবস্থাতেই মস্তক হেলন করলেন।"

ভাষা কিছুটা ভারী হলেও এর গল্পের গতি মেদহীন অত্যন্ত ঝরঝরে। একবার এর ভেতরে প্রবেশ করলে বের হওয়া অসম্ভবপ্রায়। কারণ উপন্যাসের ভেতরে যেমন মানব-মানবীর জৈবিক চাহিদার কথা আছে তেমনি আছে কৌতুকরস। একটি সার্থক উপন্যাস হতে যে সকল উপাদান লাগে তার ষোল আনাই পাওয়া যাবে প্রাদোষ প্রাকৃতজন উপন্যাসে।

উপন্যাসটিতে ঔপন্যাসিক কালজয়ী কিছু ধারণার অবতারণা করেছেন। যেমন—

১। "নদীর গতিমতি তো রমণীরই মতো, সুতরাং সেটি বোঝাও মানুষের সাধ্য নয়।"

২। "প্রলয় যখন হবে তখন কে বাঁচবে, কে মরবে, তার কোন স্থিরতা নেই। বাঁচবো বলে কৌশল অবলম্বন করলেই যে বাঁচা যাবে, তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে?"

৩। "নির্জন পথের সঙ্গী দীর্ঘ পথক্রমণকালে স্বাভাবতই বন্ধু হয়।"

৪। "উদরে ক্ষুধা থাকলে নিদ্রা দেবী নিকটে আসতে চান না।"

ঐতিহাসিক ও সাহিত্যিক মূল্যায়ন

বাংলা ঐতিহাসিক উপন্যাসের ধারায় ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ একটি অনন্য সংযোজন। সাধারণত বাংলা উপন্যাসে রাজা-বাদশাহ ও রাজপ্রাসাদের অন্দরমহলের ইতিহাসই বেশি প্রাধান্য পায়। কিন্তু শওকত আলী এই উপন্যাসে ইতিহাসকে দেখেছেন নিচুতলার মানুষের চোখ দিয়ে। সেন আমলের সামাজিক বৈষম্য, ব্রাহ্মণ্যবাদী নির্যাতন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন সংগ্রাম যেভাবে চিত্রিত হয়েছে, তা বাংলা উপন্যাসের পটভূমিকে এক নতুন উচ্চতা দান করেছে।

শেষ কথা

উপন্যাসের পরিশিষ্টে লেখক যে কয়টি লাইন লিখেছেন, তা যেকোনো সংবেদনশীল পাঠকের বুকের ভেতর হাহাকার তোলার জন্য যথেষ্ট। যাঁরা বাংলা ভাষার প্রকৃত ও মানসম্মত সাহিত্যের অনুরাগী হতে চান, তাঁদের জন্য শওকত আলীর ‘প্রদোষে প্রাকৃতজন’ একটি অবশ্যপাঠ্য ক্লাসিক মাস্টারপিস।

⭐

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? রেটিং দিন

আপনার মূল্যবান রেটিং লেখকের অনুপ্রেরণা এবং লেখার মানোন্নয়নে সহায়তা করে।

০.০ / ৫ (০টি রেটিং)

মন্তব্য (০)

এখনও কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মূল্যবান মতামত জানান।