ইতিহাসের একটা মুশকিল আছে। সে মৃত মানুষের মুখের কথা কেড়ে নিতে পারে না, আবার তাঁর মুখে এমন কথাও বসিয়ে দিতে পারে না। কিন্তু ইতিহাসের এই সহজ নিয়মটি আমরা প্রায়ই ভুলে যাই। কোনো একটি ধারণা আমাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসের সঙ্গে মিলে গেলেই আমরা তাকে ইতিহাস বলে চালাতে প্রস্তুত হই। তখন দলিলের চেয়ে বিশ্বাস বড় হয়, অনুসন্ধানের চেয়ে আবেগের দাম বাড়ে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে নিয়ে আমাদের সমাজে যে বিতর্ক চলে আসছে, তার একটা বড় অংশ এই দুর্ভাগ্যের শিকার।
রবীন্দ্রনাথের সাহিত্য নিয়ে আপত্তি থাকতে পারে, তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সমালোচনা হতে পারে, জমিদার হিসেবে তাঁর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। তিনি কোনো প্রশ্নাতীত দেবতা নন। কিন্তু তাঁকে অভিযুক্ত করার আগে প্রমাণ চাইতে হবে। বিশেষত যখন অভিযোগের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, পূর্ববঙ্গের মুসলমান কৃষকদের জীবন এবং বাঙালির সাংস্কৃতিক পরিচয়।
প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথ কি সত্যিই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন? তিনি কি প্রজাদের ওপর অত্যাচার চালানো এক সাধারণ জমিদার ছিলেন? আর বাংলাদেশের বিখ্যাত লেখক-বুদ্ধিজীবীরা তাঁর সম্পর্কে কী ভেবেছেন?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে স্লোগানের চেয়ে দলিলের কাছে, কিংবদন্তির চেয়ে ইতিহাসের কাছে ফিরে যাওযা ভালো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শত্রু রবীন্দ্রনাথ?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের পেছনে ছিল ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের পর পূর্ববঙ্গের রাজনৈতিক ও শিক্ষাগত পরিস্থিতি। ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ঢাকায় ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জের সঙ্গে নবাব সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নবাব আলী চৌধুরী, এ কে ফজলুল হকসহ মুসলিম নেতাদের একটি প্রতিনিধিদল সাক্ষাৎ করে। তাঁরা পূর্ববঙ্গে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার দাবি জানান। ২ ফেব্রুয়ারি সরকার ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিষয়ে ঘোষণা দেয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ঐতিহাসিক বিবরণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রকাশিত প্রতিষ্ঠা ও পাঠক্রমবিষয়ক গবেষণা থেকে এই প্রাথমিক ঘটনাক্রম সম্পর্কে জানা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অবশ্য সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়নি। কলকাতাকেন্দ্রিক কিছু শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এর বিরোধিতা করেছিলেন। তাঁদের আপত্তির মধ্যে ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব ও কর্তৃত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা, প্রশাসনিক বিবেচনা এবং বঙ্গভঙ্গের রাজনৈতিক পরিণতি নিয়ে উদ্বেগ। অন্যদিকে, বিরোধিতাকারী সবার যুক্তি এক ছিল না। পূর্ববঙ্গের মুসলমান সমাজের মধ্যেও কেউ কেউ মনে করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবর্তে স্কুল-কলেজে অর্থ ব্যয় করলে সাধারণ মানুষের শিক্ষার সুযোগ বেশি বাড়বে। অতএব, বিরোধিতার ইতিহাসকে এক ধর্মের সব মানুষের অভিন্ন ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানোও যথার্থ হবে না।
কিন্তু এই বিরোধীদের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কি?
অভিযোগটির বহুল আলোচিত একটি রূপ পাওয়া যায় অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল স্বাধীনতা সংগ্রামের ধারাবাহিকতা এবং প্রাসঙ্গিক কিছু কথা গ্রন্থে। পরে এ অভিযোগ নিয়ে নানা আলোচনা হয়েছে। কিন্তু আসল সমস্যা হলো, অভিযোগটির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ দলিল কোথায়?
লেখক আসহাবুর রহমান Rabindranath and Dhaka University প্রবন্ধে এম এ মতিনের বইয়ে রবীন্দ্রনাথের কথিত বিরোধিতার বর্ণনা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, ওই দাবির পক্ষে লেখক কোনো নির্দিষ্ট সূত্র দেননি। বিশেষ করে, ১৯১২ সালের ২৮ মার্চ কলকাতার গড়ের মাঠের সভায় রবীন্দ্রনাথ সভাপতিত্ব করেছিলেন—এই বহুলপ্রচারিত দাবির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এখানে আমার হাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ কালানুক্রমিক তথ্য আছে।
রবীন্দ্রনাথ ১৯১২ সালের মার্চের শেষভাগে শিলাইদহে ছিলেন। তাঁর রচনার স্থান ও তারিখ সংক্রান্ত তথ্যও সে কথার পক্ষে সাক্ষ্য সঞ্চয়িতার অষ্টম সংস্করণের ৩৩১ পৃষ্ঠায় সংকলিত ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানের রচনাস্থল হিসেবে শিলাইদহ এবং তারিখ হিসেবে ১৪ চৈত্র ১৩১৮ উল্লেখ করা হয়েছে, যা গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ২৭ মার্চ ১৯১২।
বিষয়টি নিয়ে বিচারপতি ওবায়দুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রনাথ প্রবন্ধেও এই তথ্য পর্যালোচনা করা হয়েছে। তাঁর বর্ণনা অনুসারে, রবীন্দ্রনাথ ২৪ মার্চ কলকাতা ছেড়ে শিলাইদহে আসেন এবং ১২ এপ্রিলের আগে সেখানে থেকে কলকাতায় ফেরেননি। এই সময়ের মধ্যে তাঁর রচিত একাধিক কবিতা ও গানের রচনাস্থল শিলাইদহ বলে চিহ্নিত।
এখন প্রশ্ন, একজন মানুষ একই সময়ে শিলাইদহে থেকে কলকাতার সভায় সভাপতিত্ব করেন কী করে? ইতিহাসের উত্তর দেওয়ার জন্য অলৌকিক ক্ষমতার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন তারিখ মিলিয়ে দেখার সামান্য বুদ্ধি।
আরও একটি প্রাসঙ্গিক দলিল আছে। ১৯১২ সালের ১০ জুন ব্রিটিশ পার্লামেন্টের হাউস অব কমন্সে ভারত সরকারবিষয়ক বিলের আলোচনায় ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে পেশ করা একটি প্রতিবাদী আবেদনের বক্তব সমসাময়িক সংসদীয় নথি থেকে জানা যায়, ১৬ ফেব্রুয়ারি ভাইসরয়ের কাছে একটি প্রতিনিধিদল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে বক্তব্য পেশ করেছিল। সেই বক্তব্যে বিশ্ববিদ্যালয়কে বাংলার পুনর্মিলিত জনজীবনের মধ্যে আরেকটি বিভাজনের কারণ হিসেবে দেখানোর আপত্তি ছিল।
এই নথি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরুদ্ধে প্রকৃত বিরোধিতার অস্তিত্ব প্রমাণ করে। কিন্তু এর উদ্ধৃত অংশ রবীন্দ্রনাথকে সেই বিরোধিতার সঙ্গে যুক্ত করে না। একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে, সংসদীয় আলোচনায় একটি আবেদনের অংশ উদ্ধৃত হওয়া আর তার সব স্বাক্ষরকারীর পূর্ণ তালিকা প্রকাশিত হওয়া এক কথা নয়।
অতএব, সবচেয়ে সতর্ক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত হবে এই: রবীন্দ্রনাথ ২৮ মার্চের কথিত গড়ের মাঠের সভায় উপস্থিত ছিলেন না—এ দাবির বিরুদ্ধে শক্ত প্রমাণ রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা তাঁর নামে চালানোর মতো নির্ভরযোগ্য প্রত্যক্ষ দলিলও এখন পর্যন্ত আলোচিত সূত্রগুলোতে পাওয়া যায় না।
কিন্তু এটুকু বলেই তাঁর জীবনের প্রতিটি সম্ভাব্য রাজনৈতিক মত সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। ইতিহাসের ভাষায়, কোনো অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়া এবং বিপরীত দাবির প্রতিটি সম্ভাবনা চিরতর
১৯২৬ সালের ঢাকা এবং রবীন্দ্রনাথের চিঠি
রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় ১৯২৬ সালের ঢাকা সফর।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষক ও পরে উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদার—যিনি আর সি মজুমদার নামে পরিচিত—তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ একটি চিঠি লিখেছিলেন। চিঠিটির তারিখ ১৬ মাঘ ১৩৩২ বঙ্গাব্দ, অর্থাৎ ১৯২৬ সালের জানুয়ারির শেষভাগ বা ফেব্রুয়ারির প্রথম দিক।
সেখানে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “ঢাকার জনসাধারণের পক্ষ থেকে আজ আমাকে নিমন্ত্রণ করবার জন্যে দূত এসেছিলেন।”
আরও লিখেছিলেন:
“বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃস্থিত ঢাকার লোকের নিমন্ত্রণ কোনোমতেই উপেক্ষা করা উচিত বোধ করিনে।”
চিঠিটির পূর্ণ পাঠ বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের উল্লিখিত প্রবন্ধে প্রকাশিত হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঢাকার সাধারণ মানুষের আমন্ত্রণ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রণ—দুটির জন্যই সময় ভাগ করে নিয়েছিলেন।
এই তথ্যের সঙ্গে ঢাকা সফরে তাঁর সংবর্ধনা, কার্জন হলে বক্তব্য এবং ১৯২৬ সালের জনজীবনে তাঁর উপস্থিতির বিবরণ মেলে। ১৯৩৬ সালের ২৯ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি-লিট উপাধিতে ভূষিত করে। শারীরিক অসুস্থতার কারণে তিনি অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পারেননি।
এখন কেউ বলতে পারেন, ১৯২৬ সালে সম্মান পাওয়া মানেই ১৯১২ সালে তাঁর কোনো বিরোধিতা ছিল না। যুক্তিটি অবশ্য এমন সরল নয়। মানুষ সময়ের সঙ্গে মত বদলাতে পারেন, প্রতিষ্ঠানও পুরোনো বিরোধ ভুলে সম্মান জানাতে পারে। সুতরাং পরবর্তী সংবর্ধনা অতীতের মনোভাব সম্পর্কে চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
তবু এই ঘটনাগুলোর ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। যদি রবীন্দ্রনাথ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকাশ্য ও সুপরিচিত শত্রু হতেন, তবে সেই বিরোধিতার বিশ্বাসযোগ্য সমসাময়িক সাক্ষ্য থাকার কথা। তাঁর চিঠি, ঢাকা সফর ও বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী সম্মান অন্তত সেই প্রচলিত শত্রুতার কাহিনিকে সরলভাবে গ্রহণ করতে বাধা দেয়।
ইতিহাসকে তাই দুদিক থেকেই পড়তে হবে—১৯১২ সালের দলিল, আবার ১৯২৬ ও ১৯৩৬ সালের ঘটনাও।
জমিদার রবীন্দ্রনাথ: অপরাধী, দাতা, না সংস্কারক?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদার ছিলেন। এই সত্য অস্বীকার করার কোনো প্রয়োজন নেই। তাঁর পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের জমিদারি পরিচালনার দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি পূর্ববঙ্গের শিলাইদহ, শাহজাদপুর ও পতিসর অঞ্চলে দীর্ঘ সময় কাটিয়েছেন। সেই অভিজ্ঞতার ছাপ তাঁর চিঠিপত্র, কবিতা ও গল্পে স্পষ্ট।
কিন্তু জমিদার হলেই একজন মানুষ অত্যাচারী—এমন সিদ্ধান্ত ইতিহাসের বদলে নৈতিক শর্টকাট। আবার প্রজাদের জন্য কিছু উন্নয়নমূলক কাজ করলেই কোনো জমিদারি ব্যবস্থার সব বৈষম্য মুছে যায় না। দুটি কথাই একসঙ্গে সত্য হতে পারে।
রবীন্দ্রনাথের জমিদারি-সংক্রান্ত কাজ বিচার করতে গেলে প্রথমে দেখতে হয়, তিনি কৃষকের সমস্যাকে কীভাবে বুঝেছিলেন। তাঁর কাছে গ্রামীণ দারিদ্র্য ব্যক্তিগত অলসতা বা ভাগ্যের ফল ছিল না। ঋণ, অস্বাস্থ্য, অশিক্ষা, কৃষির অনুন্নতি এবং গ্রামীণ সমাজের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা—এসবকেও তিনি দারিদ্র্যের কারণ হিসেবে দেখতেন। পল্লীপ্রকৃত গ্রন্থে সংরক্ষিত তাঁর বক্তব্যের একটি উদ্ধৃতি এর পরিচয় দেয়:
“পতিসরে আমি কিছুকাল হইতে পল্লীসমাজ গড়িবার চেষ্টা করিতেছি যাহাতে দরিদ্র চাষী প্রজারা নিজেরা একত্র মিলিয়া দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য ও অজ্ঞতা দূর করিতে পারে।”
এটি নিছক প্রজাদের প্রতি দয়ার ঘোষণা নয়; এর মধ্যে রয়েছে গ্রামীণ সমাজকে সংগঠিত করার ধারণা। তিনি চাইছিলেন, গ্রামবাসী নিজেদের সমস্যার সমাধানে সমবেত হোক এবং নিজেদের উন্নয়নের কাজে অংশ নিক।
এই কাজের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত পতিসর কৃষি সমবায় ব্যাংক।
পতিসর কৃষি ব্যাংক: ঋণ থেকে মুক্তির চেষ্টা
প্রথম আলোর পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কৃষি সমবায় ব্যাংক এবং ব্যাংকের হিসাবের খাতা নিয়ে ইফতেখার মাহমুদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশকে রবীন্দ্রনাথ পতিসরে কৃষকদের জন্য একটি গ্রামীণ সমবায় কৃষি ব্যাংক গড়ে তোলেন। প্রচলিত বিবরণে এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৯০৫ সাল বলা হয়; কিছু গবেষণায় ১৯০৫–০৬ সময়কালের কথা আসে।
ব্যাংকটির লক্ষ্য ছিল, কৃষককে মহাজনের উচ্চ সুদের ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা থেকে কিছুটা মুক্ত করা। জমিতে ফসল ফলাতে বীজ লাগে, সেচ লাগে, শ্রম লাগে; কিন্তু কৃষকের হাতে নগদ অর্থ না থাকলে তাকে ঋণ নিতে হয়। ফসল নষ্ট হলে ঋণ শোধ হয় না, আবার নতুন ঋণ নিতে হয়। এই চক্র থেকে বের হওয়ার জন্য কৃষকদের তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
এখানে আরেকটি তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। রবীন্দ্রনাথের কৃষি ব্যাংকের হিসাবসংক্রান্ত পুরোনো নথি উদ্ধার করা হয়েছে। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই খাতায় ১৩২০ থেকে ১৩৪৫ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত হিসাবের বিবরণ ছিল। তবে নথির পূর্ণাঙ্গ পাঠোদ্ধার ও গবেষণা অসম্পূর্ণ থাকার কথা প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে। ফলে ব্যাংকের প্রতিটি আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে মূল হিসাব যাচাই করা প্রয়োজন।
নোবেল পুরস্কারের অর্থ তিনি কৃষি ব্যাংক ও গ্রামীণ উন্নয়নের কাজে বিনিয়োগ করেছিলেন—এ তথ্যও বিভিন্ন জীবনী ও গবেষণায় পাওয়া যায়। তবে সুনির্দিষ্ট পরিমাণ নিয়ে পার্থক্য আছে। কোনো বিবরণে প্রায় ১ লাখ ৮ হাজার টাকা, আবার প্রশান্তকুমার পালের জীবনী-র বরাতে অন্য বিবরণে পতিসর ও কালিগ্রামের ব্যাংকে মোট ৭৫ হাজার টাকা বিনিয়োগের কথা পাওয়া যায়। ১৯১৭ সালে বইয়ের রয়্যালটি ও আমেরিকার বক্তৃতা থেকে পাওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়েও তিনি ব্যাংককে সহায়তা করেন বলে উল্লেখ রয়েছে।
অতএব, “নোবেল পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ তিনি একটিমাত্র কৃষি ব্যাংকে দান করেছিলেন”—এমন সরল বাক্য ব্যবহারের বদলে বলা ভালো, তিনি নোবেল পুরস্কার থেকে পাওয়া অর্থের উল্লেখযোগ্য অংশ গ্রামীণ কৃষিঋণ ও উন্নয়নমূলক কাজে বিনিয়োগ করেছিলেন; মোট অঙ্ক নির্ধারণে উৎসভেদে মতভেদ রয়েছে।
এই তথ্যও তাঁর কাজকে ছোট করে না। বরং ইতিহাসের প্রতি দায়িত্বশীল থাকার অর্থই হলো, প্রমাণ যতটুকু সমর্থন করে ততটুকু বলা।
কৃষিতে বিজ্ঞান এবং শিক্ষার প্রসার
রবীন্দ্রনাথ কৃষির উন্নতির জন্য কেবল অর্থ ব্যয় করেই থেমে থাকেননি। ১৯০৬ সালে তিনি তাঁর ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং বন্ধু শিরীষচন্দ্র মজুমদারের ছেলে সন্তোষচন্দ্র মজুমদারকে যুক্তরাষ্ট্রে কৃষিবিদ্যা শেখার জন্য পাঠান। উদ্দেশ্য ছিল, তাঁরা দেশে ফিরে কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞান কাজে লাগাবেন এবং কৃষকদের উন্নত পদ্ধতির সঙ্গে পরিচিত করবেন।
প্রচলিত জীবনী ও রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ উন্নয়নবিষয়ক গবেষণায় কৃষিতে যন্ত্রের ব্যবহার, নতুন পদ্ধতিতে চাষাবাদ, সমবায় সংগঠন এবং কৃষকের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের উল্লেখ রয়েছে। রথীন্দ্রনাথের স্মৃতিচারণেও ট্রাক্টর দিয়ে চাষের অভিজ্ঞতার কথা পাওয়া যায়।
কাজেই রবীন্দ্রনাথের কৃষি-উদ্যোগকে কেবল দান-খয়রাতের পর্যায়ে নামিয়ে আনা ভুল হবে। তিনি কৃষিকে জ্ঞান, বিজ্ঞান, ঋণ ও সামাজিক সংগঠনের সম্মিলিত সমস্যা হিসেবে দেখেছিলেন।
তবে একটি সংশোধন জরুরি। তাঁকে আধুনিক ক্ষুদ্রঋণের একমাত্র আবিষ্কারক বলে ঘোষণা করার যথেষ্ট ভিত্তি নেই। তাঁর কৃষি সমবায় ব্যাংককে গ্রামীণ ঋণব্যবস্থার একটি উল্লেখযোগ্য ঐতিহাসিক উদ্যোগ বলা যায়; বর্তমানের ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার সঙ্গে এর সরাসরি প্রভাব বা বংশপরম্পরা প্রতিষ্ঠা করতে আলাদা গবেষণা প্রয়োজন।
তা হলে তিনি কি অত্যাচারী জমিদার ছিলেন না?
এখানেই ইতিহাসের বিচার সবচেয়ে সতর্ক হওয়া দরকার। রবীন্দ্রনাথের গ্রামীণ উন্নয়নের উদ্যোগ বাস্তব ছিল। কৃষি ব্যাংক, কৃষিশিক্ষা, সমবায়, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসংক্রান্ত কাজের ঐতিহাসিক ভিত্তি আছে। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে তাঁর জমিদারি ব্যবস্থায় ক্ষমতার বৈষম্য ছিল না, কৃষকদের ওপর খাজনার দায় ছিল না, কিংবা প্রত্যেক প্রজা তাঁর কর্মকাণ্ডে সমানভাবে উপকৃত হয়েছিল।
জমিদারি ছিল ব্রিটিশ ভারতের ভূমিস্বত্ব ও রাজস্বব্যবস্থার একটি অংশ। রবীন্দ্রনাথ সেই ব্যবস্থার বাইরে দাঁড়িয়ে কাজ করেননি; তিনি তার মধ্যেই থেকে কিছু সংস্কারের চেষ্টা করেছিলেন। তাঁর কোনো নির্দিষ্ট প্রজার ওপর অত্যাচার, অন্যায্য খাজনা আদায় কিংবা বিপরীত কোনো অভিজ্ঞতার অভিযোগ থাকলে সেগুলোও দলিলের ভিত্তিতে পরীক্ষা করা উচিত।
সুতরাং তাঁকে একদিকে নিখুঁত মানবদরদি মহাপুরুষ, অন্যদিকে সর্বাংশে অত্যাচারী ভূস্বামী—এই দুই বিপরীত মূর্তির কোনো একটিতে আটকে রাখা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। যেটুকু প্রতিষ্ঠিত, তা হলো, তিনি জমিদার হয়েও কৃষকদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য এমন কিছু উদ্যোগ নিয়েছিলেন, যেগুলো তাঁর সময়ের গ্রামীণ বাস্তবতায় তাৎপর্যপূর্ণ ছিল।
তথ্যসূত্র ও আরও পাঠ
ক. ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও রবীন্দ্রনাথের অবস্থান
১. University of Dhaka, “Historical Outline.” ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক ঘটনাক্রম, ১৯১২ সালের প্রতিনিধিদল এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সরকারি পদক্ষেপ। বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস
২. Government of India Bill, House of Commons, 10 June 1912. ঢাকায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের বিরুদ্ধে উত্থাপিত সমসাময়িক আপত্তির সংসদীয় নথি। মূল সংসদীয় রেকর্ড
৩. ওবায়দুল হাসান, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও রবীন্দ্রনাথ,” প্রথম আলো, ২ জুলাই ২০২১। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহে অবস্থান, রচনার তারিখ, আর সি মজুমদারকে লেখা চিঠি এবং ১৯৩৬ সালের ডি-লিট বিষয়ে আলোচনা। প্রবন্ধটি পড়ুন
৪. Asahabur Rahman, “Rabindranath and Dhaka University,” Dhaka Tribune, 14 May 2018. রবীন্দ্রনাথবিষয়ক বিতর্কিত দাবির সূত্র, এম এ মতিনের বই এবং ঐতিহাসিক প্রমাণের পর্যালোচনা। প্রবন্ধটি পড়ুন
৫. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সঞ্চয়িতা, অষ্টম সংস্করণ, প্রতীক প্রকাশন সংস্থা, পৃ. ৩৩১। ‘আমার এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ’ গানের রচনাস্থল ও তারিখ যাচাইয়ের জন্য প্রাসঙ্গিক।
৬. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, পল্লীপ্রকৃতি, বিশ্বভারতী। পল্লিসমাজ, কৃষকের উন্নয়ন এবং গ্রাম পুনর্গঠনের বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব বক্তব্য জানার প্রাথমিক উৎস।
৭. প্রশান্তকুমার পাল, রবিজীবনী, ষষ্ঠ খণ্ড, পৃ. ৪৫৫–৫৬-এ উদ্ধৃত বিবরণ। কৃষি ব্যাংকে নোবেল পুরস্কারের অর্থ বিনিয়োগের বিষয়ে আলোচনার জন্য প্রাসঙ্গিক; বিভিন্ন গবেষণায় অর্থের পরিমাণের পার্থক্য লক্ষণীয়।
৮. এম মতিউর রহমান মামুন, “পতিসরে রবীন্দ্রনাথের কৃষি সমবায় ব্যাংক,” প্রথম আলো। ব্যাংকের উদ্দেশ্য, গ্রামীণ ঋণ ও হিসাবের খাতা উদ্ধারের বিবরণ। প্রবন্ধটি পড়ুন
৯. ইফতেখার মাহমুদ, “অবহেলায় নোবেলের অর্থের হিসাব-খাতা,” প্রথম আলো। পতিসর কৃষি ব্যাংকের মূল হিসাবের নথি এবং তার সংরক্ষণ-সংক্রান্ত তথ্য। প্রতিবেদনটি পড়ুন
১০. Uma Das Gupta, Tagore’s University: A History of Visva-Bharati. রবীন্দ্রনাথের শিক্ষা-ভাবনা, গ্রামীণ উন্নয়ন এবং কৃষিব্যাংকে অর্থ বিনিয়োগের প্রসঙ্গ নিয়ে গবেষণামূলক পাঠ।
মন্তব্য (০)
এখনও কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মূল্যবান মতামত জানান।
মন্তব্য করতে লগইন করুন
এই লেখাটিতে মন্তব্য বা মতামত প্রকাশ করার জন্য আপনার অ্যাকাউন্টে লগইন থাকা আবশ্যক।