অনুসন্ধান করুন

মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর: বারুদ-বয়ানের পেছনে পুষ্প-কোমলতা

পড়ার সুবিধা
হরফের আকার:

কবি আমিনা শেলীর ‘ মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর ’ কবিতাগ্রন্থে জঠর ও জরায়ুর যে প্রচারনা নজরে পড়ে, দেখেছি- এ প্রচারনায় কোনো মেকিপনা নেই, বার্তা অত্যন্ত স্পষ্ট। তারপরও আমাদের মস্তিষ্ক এক অনুসন্ধানী অনুভব নিয়ে ঘুরে বেরাতে বাধ্য হয় আমিনা শেলীর নিয়ন্ত্রিত বোধের কাছে। তার কবিতার অসংখ্য পঙক্তিজুড়ে যেন শরীর-সংগীতের স্বরলিপি সাজিয়ে রাখা হয়েছে। এসব স্বরলিপি সমাজ, ধর্ম ও পুরুষতান্ত্রিকতার খোলস ভেঙে ফেলার দ্রোহের কোরাসে লিখিত। কবি যেন পুরুষকে পরাজিত অবয়বে আঁকতে চেয়েছেন এ পৃথিবীর পবিত্র জঠরপটে । আসলেই কি শুধু তাই? এ উত্তর পেতে আমাদের ধরনা দেওয়া লাগে কবি আমিনা শেলীর যত্ন করে আড়াল করে রাখা সেই মনস্ততাত্ত্বিকনগরে। আমিনা শেলীর এ নগরে পাঠকেরা পৌঁছাতে পারলেই আবিস্কার করা সম্ভব কবির কবিতার ভেদ-মারিফত, এমনকি কবিকেও। তখন ফুটতে থাকা গোলাপের পাপড়ির মতো একটা একটা করে খুলে যেতে থাকে শরীরতত্ত্বের খোলস। আর এ গোলাপের শেষ পাপড়িটি খুলে যা্ওয়ার পর পাঠক বুঝতে পারেন – গোলপটির দেহবিন্যাস প্রস্ফুটিত হলে তা থেকে প্রথম সে সৌরভটি উড়ে যায় এ পৃথিবীর বুকে, তার নাম প্রেম।


কবি আমিনা শেলী তার কবিতায় লিখেছেন- ‘ আমি মানে শরীর/ চেতনা এক আয়না মাত্র। / ভ্রুণ ধারণের আগে জিজ্ঞাস করে না জরায়ু/ বিয়ে হয়েছে কি না ’, তাহলে তার কবিতায় দেহ-ই কি একমাত্র দৃশ্যত দস্তাবেজ? এ প্রশ্নের উত্তরে আমি আর একটু পরে যেতে চাই। কারণ গোলাপের সৌরভ আবিস্কারের আগে তার শরীর-কাঠামোটি আবিস্কারের প্রয়োজন বোধ করি। প্রারম্ভেই বলেছি, শরীরকাঠামোর বহুল প্রচারণা আমিনা শেলীর কবিতার ছত্রে ছত্রে প্রথিত আছে। যেমন ’পুরুষচোখ ’ কবিতাটিতে তিনি বলছেন, ‘ চোখ তবে যৌনাঙ্গ/ পুরুষচোখ যেখানে, বীর্যর গন্ধ পাওযা স্বাভাবিক কি?’ এভাবেই তিনি ধীরে ধীরে পুরুষতান্ত্রিকতার পর্দা খুলেছেন তার কবিতায়। একটি কথা স্বীকার করতেই হয়, মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর ’ কবিতাগ্রন্থটি মুলত সাহসীদের গ্রন্থ, পাঠককেও কবির মতোই দ্রোহবাদী চেতনায় অগ্রসর হয়ে এ গ্রন্থ হাতে তুলে নেওয়া উচিত। প্রচলিত বিশ্বাসকে পোড়াতে আমিনা শেলীর কবিতা যেন দারুণ স্পর্ধা নিয়ে কাঠ-কয়লার জোগান দিয়েছে এ গ্রন্থে। কবিতায় তিনি বলছেন:


‘যদি বেহেশতবাসী হই/ গায়ের কাফন খুলে বরণ করতে হবে/ না-জানি কোন পুরুষ’।


কিংবা-


’ মা যেদিন বলল আমার রোজা রাখতে নিষেধ/ কারণ মাসিক শুরু হয়েছে/ আমার ঈশ্বর সেদিন মারা গিয়েছিল যোনিপথে।’


ঈশ্বরকে যোনীপথে মেরে ফেলতে চা্ওয়া কবি আমিনা শেলীর এ বক্তব্য কি শুধুই প্রথা বিরোধী বয়ান? আমার তা মনে হইনি। বরং মনে হয়েছে, কিছুটা পুরুষতান্ত্রিকতার ওপর বিদ্রোহ নিয়ে এ চরণের আগমন অনিবার্য করেছেন কবি আমিনা শেলী, যখন দেখি, কবিতার তিনি ঈশ্বরকে পুরুষ হিসেবেই এঁকেছেন- ‘ আলোচনায় ফল দেবে না কারণ তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী/ এবং তোমার ঈশ্বর পুরুষ’। পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে কবি আমিনা শেলীর নারীবাদী সত্তার জাগ্রত জোয়ার যেন আমাদের সামনে আনছে শরীরকেন্দ্রিকতার নতুন অভিজ্ঞতা। কবি বলছেন:


’আমি যদি ঠ্যাং না মেলি নিতান্তই/ অন্ডকোষে লাশ হবে ঔরস তোমার্’


কবি আমিনা শেলীর ‘ মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর ’ কবিতাগ্রন্থে ঘুরেফিরে এসেছে জৈবত্বের তুমুল জলচ্ছ্বাস:


১.‘শরীরে আগুন পোড়ে নিত্য যে পাপে/ আমি তার করি আয়োজন। ’ [বাতাসে কাফন]


২.‘দানার পাগল পৃথিবী/ ডালিম গাছে ফোটে জরায়ুফুল।’ [জরাযুফুল]


৩. ‘ঠোঁটে আছে সাক্ষাতের করেবর/ চোখ বুজে নিলাম যেই, আঁধারে আউলে গেল নীল হাওর ।’ [নীল হাওর]


এ জলোচ্ছ্বাসের প্রথম দুটি ঢেউ পুরোপুরিভাবে দেহজ, কিন্তু তৃতীয় দেহজ ঢেউটি যখন ঠোঁটে এসে লাগে, তখনই ভাবনার সমুদ্রে বৈচিত্রের সৃষ্টি হয়। কারণ, ঠোঁট দেহজ, কিন্তু যখন কবি বলেন, এ ঠোঁটের সাক্ষাত-মিলনে ‘আঁধারে আউলে গেল নীল হাওর’, তখন যেন কবি আমিনা শেলীর সকল বারুদ-বয়ানের পেছনের পুষ্প-কোমরতা পাঠকের সামনে স্পষ্ট হতে শুরু করে। বোঝা যায়, নারীর ব্যক্তিগত স্বপ্নভঙ্গ, অস্তিত্ববাদী ক্ষয় ও ব্যাকুলতা কবি আমিনা শেলীর এই দ্রোহচিন্তার ভিত্তিভূমি। এখানে কবি কোমল, যখন কবি তার ’ কয়েকটা চাঁদ জাম্বুরা গাছে’ কবিতায় বলছেন:


‘হাসনাহেনার টবে দিই নতুন মাটি/ পরিপাটি বাগান হোক’। অথবা পুরুষতন্ত্রের রাজত্বে দাাঁড়িয়েও বড্ড আশাবদী হয়ে ব্যক্ত করেন: ‘শীতের বিকেলে তবু ঘুড়ি হতে যাই/ আটকে ফেলে ছাতিমগাছ।’ যদিও এই কবি বিরহের অনলে পুড়ে যাওয়া বাক্য সযত্নে নিজেই সাজিয়ে রেখেছিলেন তার কবিতার শরীরে: ‘এক পুথিবী সবুজ নিয়ে ফিরিয়ে দিলে খড়’। অথবা যেমন : ‘ জং ধরে মাসিকের পথে/ কতকাল লাঙল পড়েনি এ মাঠে’।


নারীর ব্যক্তিগত এসব বিপন্নতার মাঝেও এক বিষাদ-সন্ধ্যায় শেলী যেন হয়ে উঠতে চাইলেন এক অনুভূতির অনুবাদক। তার কবিতার বোধকে তিনি খুব সচেতনভাবে বহুমুখী করে তুলতে চাইলেন। যদিও প্রেমাস্পদের পাপ ও অপরাধ শেলীর কবিতায় দেহজচিন্তা ও দ্রোহের অনিবার্যতা নির্ধারণ করে দেয়। আর এ কারণেই বোধহয় রক্ষণশীল ঘরণার চিন্তাকে অগ্রাহ্য করে শেলী তার কবিতায় নতুন বয়ান সংযোজন করতে পারেন। তার কবিতার শরীরে আধ্যাত্মিক আলখিল্লা পরানো নেই। হয় তো ইচ্ছে করেই পরাননি। হৃদয়-উচ্ছ্বসিত মাধুর্য-সংগীতের ভেতরেও দেখা মেলে কবির নির্মম নিয়ন্ত্রণ। তাই তো বক্তব্যকে বারুদবাণে বিকশিত করার বিশদ কৌশল জানা দক্ষ কারিগর কবি আমিনা শেলী নিজের চিত্রলিপি খোঁদাই করলেন মাটির প্রতীকে এবং পুরুষতন্ত্রের পরাজয় নিশ্চিত করে পৃথিবীর নিকট ভবিতব্য রেখে গেলেন:


‘ যার বাহুর দাপটে লুকিয়ে থেকেছি ঘাসের ভেতর/ নির্ঘাত মাটিতে আসবে সে।’


কবি আমিনা শেলীর ‘ মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর ’ কবিতাগ্রন্থটিকে আমি প্রথাবিরোধী বয়ানের এককেন্দ্রীকতার ভেতর আটকে ফেলতে চাই না। এ গ্রন্থের বক্তব্যের বহুগামীতা বিশদভাবে বিবেচ্য। এখানে কবি আমিনা শেলী কাব্যবাক্যের থরে থরে সাজিয়ে রেখেছেন বিদ্রোহ, বিরহ, বিচ্ছিন্নতা এবং সর্বপরি প্রেম। তবে তার এ গ্রন্থপাঠে এটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে কবি খুব সজাগ দৃষ্টিতে পাঠককে বোধের জগতে নিয়ে যাওয়ার এক সাহসী সক্ষমতা রাখেন, যা বিষয়-বৈভবে আমিনা শেলীর কবিতায় এক স্বতন্ত্র মাত্রা নির্মাণ করে। তা না হলে কতোটা দুঃসাহস নিয়ে একজন কবি বলতে পারেন:

‘বেঁচে আছি নরকে/ রিদমটা জোশ!’


মহাবিশ্ব জরায়ুর ভেতর

ধরণ: কবিতা

কবি : আমিনা শেলী

প্রচ্ছদ: মামুন হোসাইন

প্রকাশনী: পয়স্তি প্রকাশন
পৃষ্ঠা : ৮০
মূল্য : ৩২০ টাকা
প্রকাশকাল: অমর একুশে গ্রন্থমেলা, ২০২৬

⭐

লেখাটি আপনার কেমন লাগলো? রেটিং দিন

আপনার মূল্যবান রেটিং লেখকের অনুপ্রেরণা এবং লেখার মানোন্নয়নে সহায়তা করে।

৫.০ / ৫ (১টি রেটিং)

মন্তব্য (০)

এখনও কোনো মন্তব্য করা হয়নি। আপনার মূল্যবান মতামত জানান।