রহমান মুকুল
বার পড়া হয়েছে
প্রকাশিত :
জুন ৩, ২০১৯
শেয়ার :
পয়স্তিতে যারা লিখেছেননির্দেশিকাশর্তাবলী
রহমান মুকুল

আত্মঘাতী বাঙালী ও কৃষকের চিরস্থায়ী বন্দবস্ত দুর্ভাগ্য

না, এটা প্রখ্যাত লেখক নিরোদ সি চৌধুরীর লেখা প্রবন্ধ নয়। এটা বাংলাদেশের সাংঘাতিক নির্মম বাস্তবতা। এ বাস্তবতা আজ এক সাগর রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব আর আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে বড়ই নির্দয়ভাবে বিদ্রূপ করে চলেছে। যে আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে লক্ষ প্রাণ বিসর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অভ্যুদয়, তা আজ ব্যর্থ হতে চলেছে। এ যেন যে কৃষক তাজা বুকের রক্ত অকাতরে ঢেলে দিয়ে দেশ মাতৃকা বার বার গোলামীর জিঞ্জিরমুক্ত করেছেন ঠিক তাদের বিরুদ্ধেই সুগভীর ষড়যন্ত্র। এ ষড়যন্ত্র যুগ-যুগান্তরের। সুদূর অতীতে বিনিময় প্রথায় যখন মুদ্রা প্রবেশ করেছে সেই কুক্ষণে সূত্রপাত। কেন বাঙালি আত্মঘাতী তার কিঞ্চিৎ নতিজা তুলে ধরা যাক –

 ১) কৃষিখাতঃ বাংলাদেশ মূলতঃ কৃষিনির্ভর দেশ। বাংলাদেশের অর্থনীতি মূলতঃ লাঙ্গলের ফলার অর্থনীতি। অথচ এহেন কৃষির উন্নয়নে, কৃষকের উন্নতিতে কোন সরকার সত্যিকার অর্থে বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছেন কি? মূলতঃ কৃষক শ্রেণির আত্মত্যাগের বিনিময়ে এ দেশ স্বাধীন হওয়ার পর কৃষিজ পণ্যের দাম ব্যতিত অন্যান্য ভোগ্য পণ্যের দাম যত গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, তার এক দশমাংশ কি ধানসহ প্রধান কৃষিজ পণ্যের দাম বেড়েছে? কৃষকের শ্রম চুরির এমন জ্বলন্ত উদাহরণ সারা সভ্য বিশ্বে কি একটিও আছে? তাহলে কীভাবে ভাবতে পারি এ দেশে কোন না কোন সরকার কৃষিবান্ধব ছিল? অথচ গত কয়েকটি যুগ ধরে দেশ চালাচ্ছেন প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে কৃষকের সন্তান;তাদের নাতি-পুতি। অথচ, বাহ্যত এ জাতি কত বেশি কৃষিবান্ধব! আমলাসকল এই অনলবর্ষী মে মাসে চাষির সাথে ধান কাটছেন ( নাকি ফটোসেশান), ছাত্রলীগ ধান কাটছেন, এমনকি প্রধানমন্ত্রী সুস্থ্য থাকলে মাঠে গিয়ে ধান কেটে দিতেন বলেও মন্তব্য করেছেন। কৃষির বা কৃষকের প্রধান সমস্যা প্রকৃতপক্ষে কী? ধান না কাটতে পারা? নাকি উৎপাদিত কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম না পাওয়া? স্পষ্ট করে বলেন তো -- কৃষক কি কখনও অনুকম্পা চেয়েছেন? নাকি ন্যায্য অধিকার? যারপরনাই নিরুপায় হয়ে কৃষক চেয়েছেন তার কষ্টসৃষ্ট ফসলের ন্যায্য মূল্য, চেয়েছেন প্রাপ্য মর্যাদা। তাদের এ দাবির প্রেক্ষাপট অস্তিত্ব রক্ষার।

 ২) পাটঃ পাট আজোবধি অন্যতম প্রধান কৃষিজপণ্য। নিকট অতীতেও নাকি পাট ছিল সোনালী আশ। পাটকে আঞ্চলিক উচ্চারণে কুষ্টা বলি। কুষ্টার অতীত কতটা গৌরাবান্বিত ছিল তা জেলা শহর কুষ্টিয়ার নামিকরণ থেকে বোঝা যায়। এ অঞ্চলে উৎপাদিত উন্নতমানের পাট নাকি স্বর্ণমুদ্রায় বিকাত। সেই মুদ্রাস্ফীতিতেই নাকি নব্যসৃষ্ট জমিদার ও এলিট শ্রেণির বসবাসযোগ্য কলকাতা শহর সৃষ্টি। প্রান্তিক পাটব্যবসায়িদের সৌকর্যময় ইতিহাস রয়েছে। আমাদের মফস্বল আলমডাঙ্গা থেকে স্বর্গীয় গঙ্গাধর জালান কিংবা তৎকালীন প্রত্যন্ত হাটবোয়ালিয়া থেকে ব্রিটেনের শিল্পনগরী ডান্ডিতে সরাসরি পাট পাঠানো হত। স্বাধীন দেশে সে সোনালী আশ হল কৃষকের গলার ফাঁস। পাটের সেই স্বর্ণালি ঐতিহ্য হরণ করল কোন হার্মাদ? আসুন, এত অত্যাচার-নিপীড়ন, অবহেলা ও শঠতার জলদগম্ভীর ইতিহাস মাড়িয়ে দুর্বিনীতের ন্যায় বেঁচে থাকা কৃষকের পাশে দাঁড়াই। তাদের কণ্ঠের সাথে কণ্ঠ সাধি। রক্তের ঋণ শোধ করি।

 ৩) সুগার মিলঃ এ দুর্ভাগা জাতিকে আলো দেখিয়েছিল একদা দর্শনা কেরুজসহ বেশ কয়েকটি সুগারমিল। পাকিস্তান শাসন-শোষণেও এগুলি ছিল বাঙ্গালী জাতির এক মুঠো স্বপ্ন। অথচ দেশ স্বাধীনের পর সে স্বপ্ন-সাধ গুড়িয়ে দিল কে?

৪) মোহিনী মিলঃ কুষ্টিয়ার মোহিনী মিল ছিল এ চির বঞ্চিত সর্বহারা বাঙ্গালীর আরেক স্বপ্নসৌধ। এশিয়ার অর্থনৈতিক বাঘ্র। কার ষড়যন্ত্রে আজ তা বিরাণভূমি?

৫) আধুনিক সেচ প্রকল্পঃ পাকিস্তান শাসনামলে সৃষ্ট আধুনিক কৃষির নিয়ামক - ওয়াবদা তথা পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রতিষ্ঠালগ্নেই যা কৃষকদের জন্য আশির্বাদ বয়ে এনেছিল। সেই ওয়াবদার গরিমা নষ্টের নটরাজ কারা?

৬) শিক্ষাঃ শিক্ষা জাতির মেরুদন্ড। অতীতে এ দেশের শিক্ষার মান বিশ্বনন্দিত ছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড বলা হত। এখন? বিশ্ব বাদ দিলাম। এশিয়ার ৫ শ বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম থাকে না। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের মানের কথা উল্লেখ না করলেও চলবে নিশ্চয়। এদেশে বিশ্বমানের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করল কারা? কারা শিক্ষাকে ব্যবসাপণ্যে রূপান্তরিত করে প্রকৃত শিক্ষার দায়িত্ব জিবরাঈল ফেরেস্তার নিকট হস্তান্তর করল?

৭) গার্মেন্টস শিল্পঃ গার্মেন্টস শিল্প বা আরএমজি বর্তমানে দেশের অন্যতম প্রধান অর্থনৈতিক চালিকা শক্তি। অর্থনীতিতে অপার সম্ভাবনা সৃষ্টি করেছে এ শিল্প। বিপুল বেকার সমস্যা সমাধানে এ শিল্পের ভূমিকা অতুলনীয়। নারীর অর্থনৈতিক মুক্তি, মর্যাদা ক্ষমতায়নেও গার্মেন্টস শিল্প প্রধান দায়িত্ব কাঁধে তুলেছে। অবহেলিত, অপাংক্তেয় ও দুর্দশাগ্রস্থ নারীসমাজকে ভালভাবে বাঁচার প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে। পরোক্ষভাবে এ শিল্প বহু কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করেছে। ইতোমধ্যে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশ নিজস্ব ব্র্যান্ড সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।

          কিন্তু অপার আশা জাগানিয়া গার্মেন্টস শিল্পের অপ্রতিরোধ্য গতি রোধ করতে নানা বা%ধা-বিপত্তি ও ষড়যন্ত্রের কমতি নেই মোটেও। সন্তোষজনক মজুরী নির্ধারণ না হওয়া, শ্রমিক অসন্তোষ। মালিক-শ্রমিকের অনাকাঙ্খিত সম্পর্ক, অগ্নিকান্ড, বৈদেশিক বাঁধা, প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের ষড়যন্ত্র এ শিল্পের অগ্রযাত্রায় পদে পদে বিপত্তি সৃষ্টি করে চলেছে। দেশ স্বাধীনের এত বছরেও এ অপার সম্ভাবনাময় শিল্পের চালিকাশক্তির মজুরী সন্তোষজনক নির্ধারন করে দিতে পেরেছি? এ শিল্পবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছি? বিদেশী বাঁধা সমূহ সাফল্যের সাথে উৎরে যেতে, প্রতিদ্বন্দ্বি দেশের ষড়যন্ত্র রুখে দিতে কার্যকর ভূমিকা ও নীতিমালা তৈরি করেছি?

 ৮) রেমিট্যান্সঃ

পৃথিবীর অন্যতম জনবহুল দেশ বাংলাদেশ। সৌভাগ্যের কথা হল – দেশটির সবচে’ বড় সম্পদ হল জনসংখ্যা। নিম্ন আয়ের অচলায়তন ভেঙ্গে বেরিয়ে মধ্যমায়ের সীমারেখায় প্রবেশ করেছে দেশটি। মধ্য আয়ের দেশগোষ্ঠিতে অন্তর্ভূক্তিতে আসলেই রাজনৈতিক তেমন কারিশমা নেই। নেই চাকরিজীবী কিংবা ব্যবসায়িদের বিরাট ভূমিকা। এ সাফল্যের সিংহভাগ কৃতিত্ব অশিক্ষিত-অল্প শিক্ষিত প্রবাসি বাংলাদেশীদের।  বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি কাজ করছেন। বিদেশ থেকে তারা বিরাট অংকের রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। জানা যায় – বিশ্বে রেমিট্যান্স প্রাপ্তির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান অষ্টম। মূলতঃ প্রবাসিদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর দাঁড়িয়ে স্বপ্ন দেখছে বাংলাদেশ।

অথচ, আমরা কি প্রবাসি বাংলাদেশিদের জন্য বাস্তবিক কিছু করেছি?  আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে আমাদের প্রবাসিদের অদক্ষ শ্রমিক বলা হয়। দক্ষ জনসম্পদে পরিণত করতে কি বাস্তবভিত্তিক কোন পদক্ষেপ ছিল?  রেমিট্যান্স বাড়াতে কী পদক্ষেপ নিচ্ছি? প্রতিবেশি ভারতের একজন শ্রমিকের বেতনের তিন ভাগের এক ভাগ আমাদের বাংলাদেশি শ্রমিকের বেতন। বাংলাদেশি শ্রমিকরা যাতে দক্ষ শ্রমিক হয়ে না উঠে এ জন্য নাকি আন্তর্জাতিক মহলের ষড়যন্ত্র রয়েছে। এ ষড়যন্ত্রে অংশ রয়েছে নিজ দেশের সংশ্লিষ্ট রাঘব-বোয়ালদের। এমন অভিযোগ বেশ পুরাতন। দেশে শ্রম ও জনশক্তি বিষয়ক মন্ত্রণালয় আছে। আছেন অমিত ক্ষমতাধর ডাকসাইটে মন্ত্রী। অথচ যুগের পর যুগ এ সমস্ত সমস্যার সমাধান হয়না। ১০/ ১২ বছর পূর্বে বিদেশ যাওয়ার হার বর্তমানের কয়েক গুন বেশি ছিল। এখন কেন বছরের পর অচলাবস্থা বিরাজ করে? কেন মালয়েশিয়া, সৌদিসহ উপসাগরীয় দেশের কলিং বাংলাদেশিদের জন্য বন্ধ থাকে? এ জন্য কি আমাদের বন্ধ্যা পররাষ্ট্রনীতি দায়ি না? আচ্ছা বলেন তো – বিদেশে অবস্থিত আমাদের দূতাবাসের একজন রাষ্ট্রদূতও কি প্রবাসি শ্রমিকবান্ধব? “রাত পোহাবার আর কত দেরি পাঞ্জেরী?”  

৯) গরু মোটাতাজাকরণঃ  লাগাতার তেলের মূল্য, দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিল, সার-কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণের সীমাহীন মূল্যবৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রতিকূলতা ও বাজারে ধানের মূল্য ক্রমশঃ নিম্নগামি হওয়ায় কৃষিকাজে নিরুৎসাহিত হচ্ছেন কৃষকরা। এদের বড় একটি অংশ গরু মোটাতাজাকরণে অধিক গুরুত্বারোপ করেছেন। ভাগ্যাহত কৃষকের জন্য আশির্বাদ বয়ে এনেছে এ গরু মোটাতাজাকরণ। এ কাজটিই তাদের অর্থনৈতিক শ্রীবৃদ্ধি ঘটাচ্ছে। অথচ এ ব্যাপারে তাদের কতটুকু প্রশিক্ষিত করে তোলা সম্ভব হয়েছে? কতটুকু আর্থিক নির্ভরতা দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকলোন প্রাপ্তিতে শর্তাবলি কি আদৌ সহজলভ্য করা হয়েছে? কী বলেন আপনারা? 

১০) পলাশীর আম্রকাননে অস্তমিত স্বাধীনতার সূর্যঃ লর্ড ক্লাইভ তার ডায়েরিতে লিখেছেন - পলায়নপর নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে যখন ধরে ব্যঙবিদ্রুপ করে টেনে হিচড়ে নিয়ে যাওয়া হয়, সে সময় কলকাতা এলাকার মানুষ রাস্তার দুধারে জড়ো হয়ে সে দৃশ্য অবলোকন করছিল আর আমোদিত হচ্ছিল। পিঠে ছুরিকাঘাতের পূর্বে নবাবকে কাঁটার সিংহাসন ও ছেড়া জুতা দিয়ে অপমান করা হয়, সে সময় শ শ মানুষ বিনোদনের খোরাখ খুঁজে পেয়েছিল। যুদ্ধে নবাবের প্রায় ১০ হাজার অশ্ববাহিনি, ৩০ হাজার পদাতিক এবং অসংখ্য কামান-গোলা বারুদসহ বিশাল সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনীর বিপরীতে রবার্ট ক্লাইভের সৈন্য সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। যার মধ্যে ৯ শ জন ছিল হাত-পায়ে ধরে নিয়ে আসা ব্রিটিশ সেনাবাহিনির সৌখিন অফিসিয়াল সদস্য ছিল, যারা তলোয়ার ধরতেও জানতো না। ক্লাইভ মন্তব্য করেছেন -  রাস্তার দুপাশের বাঙ্গালীরা যদি গুটি কয়েক ঈংরেজ সৈন্যের প্রতি একটি করে মাটির ঢিল ছুঁড়ে দিতেন, তাহলে ঢিলের স্তুপে ঢাকা পড়ত ইংরেজ বাহিনি।

 সত্যিই, আত্মঘাতী বাঙালী পৃথিবীতে পিয়ারলেস। কে বহন করবে এ নির্বোধ জাতির আত্মঘাতী কর্মকান্ডের দায়-দায়িত্ব? বসে আছি শুধু তাঁহার তরে।

- রহমান মুকুল
menu-circlecross-circle