দিনের আকাশ কালো হয়ে রাত্রি নেমেছে। সূর্য অস্ত গিয়েছে অনেক আগে। নদীর ধারের কাশবনে এখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক। তার পাশ ঘেঁষে চারিদিকে তাকালে গাছপালার চিহ্ন পাওয়া যায় না, যেন ধূ-ধূ মাঠ। সেখানে রয়েছে পুরোনো একটা মাটির ঘর, গোলপাতার ছাউনি। বৃষ্টির চাপে ভেঙে গেছে কিছু কিছু জায়গায়। নব্বই বছরের বিধবা লণ্ঠন জ্বালিয়ে নকশী কাঁথায় সুঁচ দিয়ে নকশা তুলছে। তার চোখ ঝাপসা, হাতে কাঁপুনি, তবুও সেলাই থামে না। কালো চুলের হদিস নেই মাথায়। গায়ের চামড়া কুঁচকে গেছে, হাড় জিরজিরে হাত-পা, শিরাগুলো দেখা যাচ্ছে।
এই ঘরে তার তেতাল্লিশ বছরের বাস। ছেলেরা তাড়িয়ে দিয়েছে অনেক আগে, হাতেপায়ে ধরে ছিল দুটো ভাতের জন্য। আশ্রয়টুকুও জুটেনি; ভাত তো দূরের কথা। তারা নাকি দয়া করে মাকে এই ঘরটা বানিয়ে দিয়েছে, তাও দুই পয়সা খরচ হয়েছিল বলে বউরা অশান্তি করেছিল। বুড়ি এর ওর বাড়ি ভিক্ষা করে, কচু শাক সেদ্ধ করে খায়। কোন কোনোদিন নদীর পানি দিয়ে ক্ষুধা মেটায়।
বুড়ির বাড়ি থেকে কিছুদূর গেলেই চেয়ারম্যানের বাড়ি। লিপি সেখানে কাজ করছে দু’ বছর হলো। তার এখন পনেরো বছর বয়স। তার সঙ্গে বুড়ির খুব ভাব; চুরি করে এটা সেটা এনে খাওয়ায় বুড়িকে। বুড়ির একটা নাতনি আছে। একদিন বুড়ি ভাত চেয়েছিল বলে সে নাকি বুড়ির চুলের মুঠো ধরে টেনে বের করে দিয়েছে।
লিপি এমন নয়। সে বুড়িকে অবাক চোখে প্রশ্ন করে, "তোমাকে একা থাকতে ভয় করে না?" বুড়ি হেসে উত্তর দেয়, "এতকাল থেকেছি, সহ্য হয়ে গেছে। আর কতদিনই বা আছি বল?"
লিপি ভয় পায়। বুড়ি চলে গেলে তাকে দেখবে কে? লিপির মা কলেরায় মারা যায় যখন, তখন লিপির বয়স পাঁচ বছর। তখন তার দুই বছর বয়সী এক ভাই ছিল; সেও পানিতে ডুবে মারা যায় মা মরার এক বছর পর। লিপির বাপের ছিল মদের নেশা। প্রতিদিন মদ খেয়ে বাড়ি এসে বউকে পেটানো তার কাছে ছিল বিরাট পুণ্যের কাজ। লিপির মা মরার পর বাপ তার দায়িত্ব নিতে চায়নি। নতুন সংসারের সাধ হলো তার । ঘরে নতুন বউ আনার জন্য মন ব্যস্ত হলো। তাই সে বিয়ে করে অন্য গ্রামে চলে গেল। লিপি পড়ে রইলো একা। বুড়ি যেমন পেটের দায়ে ভিক্ষা করে, তেমনি লিপিও আগে ক্ষুধার জ্বালায় রাস্তার ধারে বসে ভিক্ষা করত। একদিন চেয়ারম্যানের বউয়ের তাকে দেখে মায়া হলো। সে লিপিকে নিয়ে এলো তার বাড়িতে। বিনা কাজে কেউ ভাত দেয় না; চেয়ারম্যানের বউও দিতো না, কারণ চালের দাম অনেক। লিপি উদয়-অস্ত পরিশ্রম করে; নদী থেকে কলসি কলসি পানি আনে, পানির কলসি হালকা শরীরে লোহার বোঝার মতো মনে হয়। বাড়ির লোকের রান্না একা হাতেই সামলায় সে। বিনা পয়সার দাসী বাড়িতে থাকলে ভিখারিও কাজ করতে চায় না। তার এত চাপা কষ্টের মাঝে বুড়ি ছিল তার শান্তির জায়গা।
লিপির চুলে তেল জোটে না, ভালো একটা পরনের কাপড় জোটে না। সে নিজেকে হয়ত আয়নায় দেখে না, তাই কাজলও দেওয়া হয় না চোখে। অথচ তার দুটি চোখ হরিণের মতো। তার হরিণ চোখে কয়েকদিন ধরে একটা ছেলের ছবি মাঝে মাঝে হুট করে ভেসে ওঠে। প্রতিদিন পানি আনতে যাওয়ার সময় লিপির দেখা হয় তার সাথে। তাকে দেখে লিপি মুচকি হাসে। তার হৃদয়ে বসন্তের আবির্ভাব হয়। আবছা আলোকসজ্জিত ঘরে বসে তার চোখ নতুন স্বপ্ন দেখে। একদিন রাস্তায় দেখা হলে ছেলেটি তাকে প্রশ্ন করে,
-তোমার নাম কি? রোজ দেখি এই পথ দিয়ে যাও। কোথায় বাড়ি তোমার?
-আমার নাম লিপি। আপনার নাম কি? চেয়ারম্যানের বাড়িতে কাজ করি। পানি আনতে গিয়েছিলাম। আপনি বুঝি এই পথ দিয়ে স্কুলে যান?
-আমার নাম জীবন। হ্যাঁ, আমি পাশের স্কুলে পড়ি। তোমার সাথে প্রতিদিন দেখা হয় তাই জানতে চাইলাম।
-আজ আসি। অনেক কাজ আছে।
লিপি কথোপকথন আর দীর্ঘায়িত করলো না। কারণটা অনাগ্রহ নয়। লজ্জা।
এভাবে প্রতিদিন তাদের কথা হয়। মনের ভালোলাগা থেকে এক অদ্ভুত মায়া সেই পথে দেখা ছেলেটির প্রতি ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে লিপির। একদিন দেখা না হলে যেন দম বন্ধ হয়ে আসে তার। একদিন ছেলেটা জিজ্ঞেস করলো,
-আচ্ছা, তোমার পড়তে ইচ্ছা করে না?
-করে তো, কিন্তু আমার কপালে ওসব নেই। কোনোমতে খেতে পারছি এই অনেক। বেঁচে থাকাটাই এখন আমার কাছে বিরাট ব্যাপার।
-তোমার জন্য আমার কষ্ট হয়। কীভাবে সহ্য করেছো এত কষ্ট। তোমার কষ্টের ভার হয়ত আমি নিতে পারব না কিন্তু তোমার কষ্ট লাঘব করে দিতে পারি।
-কীভাবে?
-তোমার ভালো বন্ধু হয়ে। আমি তোমাকে পড়াশোনা শেখাবো। দেখবে, তোমার আর কোনো দুঃখ থাকবে না। তোমার সব কথা তুমি আমার সাথে বলবে। জানবে আমি তোমার জন্য সবসময় আছি।
-এত সুখ আমার কি সহ্য হবে। তোমার বাবা মা জানতে পারলে খুব রাগ করবে। কাজের মেয়ের সাথে মেলামেশা তারা পছন্দ করবে না।
-সেসব আমি দেখব। তোমাকে একদিন না দেখলে আমার কেমন যেন লাগে।
-কেমন লাগে?
-জানিনা …..
সেদিন বিকেলে লিপি বুড়ির কাছে যায়। আনমনা হয়ে বুড়িকে প্রশ্ন করে,
-বুড়ি, কাউকে ভালোবাসা বুঝি অন্যায়?
-কেন রে?
-আহ! বলো না!
-না না, অন্যায় কেনো হবে। ভালোবাসার থেকে সুন্দর অনুভূতি দুনিয়ায় আর আছে নাকি! হঠাৎ এই কথা জানতে চাইলি যে! কাউকে মনে ধরেছে বুঝি?
-ইশ! কি যে বলো না!
লিপির মুখ লালচে হয়ে গেলো। সে আর কোনো কথা না বলে এক দৌঁড়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাড়ির দিকে ছুটে গেলো।
এদিকে চেয়ারম্যানের ছেলের জুয়ার নেশা; চোখে-মুখে সবসময় শয়তানির ছাপ। লিপি বুঝতে পারে, ওর হায়নার মতো চোখ তাকে ছিঁড়ে খেতে চায়। লিপির কিছু করার নেই; পেটের ক্ষুধা মেটানোর দায় আছে তার। তাছাড়া তার হৃদয়ে এখন ভালোবাসা উপচে পড়ছে তার প্রেমিক পুরুষের প্রতি। তাই কোনো শয়তানের শয়তানি দৃষ্টি তার হৃদয় টলাতে পারেনা।
এক বছর কেটে যায়। বুড়ির শরীর এখন মাঝে মাঝেই খারাপ হয়। তাও লিপি আসলে বুড়ি গল্প করে, তাকে রান্না করে খাওয়ায়, লিপির চুল বেঁধে দেয়। একদিন বুড়ি ভাত রান্না করে, শাক সেদ্ধ করে লিপির জন্য অপেক্ষা করে। সে আসে না। সেদিন লিপি তার ছোট্ট ঘরে বসে সারাদিন পরে এক মুঠো ভাত মুখে দিয়ে পেটের ক্ষুধা মেটায়। কিন্তু চেয়ারম্যানের ছেলেরও ক্ষুধা লাগে — শরীরের ক্ষুধা। তাই সেদিন সে লিপির ভাতের থালায় লাথি মেরে উড়িয়ে দিলো একদিকে, মুখ চেপে ধরলো লিপির; লিপি আওয়াজ করতে চাইল, কিন্তু তার মুখ থেকে গোঙানির আওয়াজ ছাড়া আর কিছু বের হলো না। সে চিৎকার করে বলতে চাইলো, "জীবন, আমাকে বাঁচাও। আমি শুধু তোমার। আমাকে তোমার কাছে নিয়ে যাও।" কিন্তু সে বলতে পারলো না কিছুই। সবকিছু নিস্তব্ধ হয়ে গেলো। বুড়ির মাটির ঘরের পাশে রাস্তা আছে। সেখানে লাঠি ভর দিয়ে কোনোভাবে লিপির সন্ধানে গেলো সে। লোকেরা বলল লিপি গলায় দড়ি দিয়েছে। বুড়ি কথাটা শুনে আর কোনো কথা বলতে পারলো না। তার হাঁপানির টান আসলো। এগোতে পারলো না সে। লোকেরা ধরাধরি করে তাকে বাড়ি পৌঁছে দিল। একটু সুস্থ হলে বুড়ি আবারো রাস্তায় গিয়ে লোকদের সাহায্য নিয়ে লিপিকে দেখতে গেলো। গিয়ে দেখলো লিপির নিথর দেহ মাটিতে শোয়ানো। সাদা কাপড়ে ঢাকা। লিপির মৃত্যুর রহস্য বুড়ির অবুঝ মন বুঝল না। বুড়ি শুধু এইটুকু বুঝল যে, লিপি আর কোনোদিন হাসবে না, কথা বলবে না, দৌড়াবে না। লিপির দাফন হয়ে গেলো। তার মৃত্যুর খবর জীবনের কানে পৌঁছালো। জীবনের চোখ ছল ছল করে উঠলো। লিপিকে যে অনেক কথা বলার ছিল তার। সে লিপিকে বলতে চেয়েছিল,"তোমাকে ভালোবাসি" কিন্তু আর বলা হলো না।
এরপর কেটে গেছে অনেকদিন। জীবন আগের মত রোজ স্কুলে যায়। কিন্তু লিপির সাথে আর দেখা হয় না। ধীরে ধীরে নিঃসঙ্গতা গ্রাস করে তাকে। সে মনে মনে বলে,"কার সাথে কথা বলবো আমি আর! আমার কথা বলার মানুষটাই তো হারিয়ে গেছে।" বুড়ির ঘরে রাত্রি নামলে আলো লণ্ঠনের জ্বলে। কিন্তু লিপির ঘর এখন অন্ধকার। সেখানে কখনও আলো জ্বলবে না। নারীর সম্মান কেউ হরণ করলে সেই নারীকে আর বাঁচিয়ে রাখা হয়না। তাকে কণ্ঠরোধ করে ঝুলিয়ে দেওয়া হয়। রাশি রাশি মাটির চাপে তাকে কবরে পাঠানো হয়। চেয়ারম্যানের ছেলেদের বিচার হয় না। লিপিদের পক্ষ নিয়ে কেউ মামলা লড়ে না। তাই তাদের কণ্ঠরোধ হয়ে যাওয়াকে আত্মহত্যা বলে প্রচার করা হয়। বুড়ির অবুঝ চোখ এসব বোঝে না। সে চমকে উঠে ভাবে, "লিপির একা থাকতে ভয় করবে না তো?"
© সাদিয়া মুনমুন

