লেখক প্যানেল
আতিকুর ফরায়েজী

দেহের উচ্চারণ, প্রেমের ভাষা: আমিনা শেলীর দেহপসরা

আধুনিক বাংলা কাব্যধারায় দেহ নিয়ে কবিতা লেখা নতুন নয়। রবীন্দ্রনাথের কবিতায় যেমন দেহ থাকে ঈশ্বর ও প্রেমের মাঝে, জীবনানন্দে তা হয় এক ধূলিস্নাত চেতনার প্রতিধ্বনি, আবার শক্তি চট্টোপাধ্যায় কিংবা নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় দেহকে দেখা যায় যৌবনের আবেদন কিংবা দ্রোহের ভাষা হিসেবে। তবে একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকের কবিদের মধ্যে দেহ নিয়ে চর্চা আর আগ্রহ নতুনভাবে গভীরতর হচ্ছে। এই প্রেক্ষিতেই আমিনা শেলীর দেহপসরা কাব্যগ্রন্থটি বাংলা কবিতায় এক স্বতন্ত্র সংযোজন, যা নারী-কবি হিসেবে নয়, বরং একজন সংবেদনশীল, আত্মসন্ধানী কবি হিসেবে শেলীর কাব্যদৃষ্টিকে সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে।

দেহ: একটি আত্মবিশ্লেষণাত্মক ক্ষেত্র

দেহপসরা কাব্যগ্রন্থের নাম থেকেই স্পষ্ট হয়—এই কাব্য একটি দেহের প্রদর্শনী নয়, বরং দেহকে ঘিরে চেতনার, অভিজ্ঞতার এবং উপলব্ধির যে বহুমাত্রিকতা, তারই এক কাব্যিক উপস্থাপন। কবিতাগুলোয় দেহ কখনো হয়ে ওঠে কামনার কেন্দ্র, আবার কখনো আধ্যাত্মিকতার বাহক। দেহ এখানে অবদমনের প্রতীক নয়, বরং আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। কবি দেহকে স্বাভাবিক, জৈবিক, মানবিক একটি সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করেন—যার মাধ্যমে মানুষ প্রেম করে, ব্যথা পায়, আকাঙ্ক্ষা করে, ঈশ্বরের স্পর্শ খোঁজে, আবার নিজেকেই খুঁজে ফেরে।

এই কাব্যগ্রন্থে দেহ ও প্রেম একে অপরের সঙ্গে জড়াজড়ি করে থাকে। প্রেম শুধুমাত্র হৃদয়ের নয়, দেহেরও। বরং কবি এমন একটি অবস্থান থেকে কথা বলেন, যেখানে মন আর দেহের দ্বন্দ্ব নেই। প্রেমিকের প্রতি আকর্ষণ যেমন মনের, তেমনি তা চিহ্ন রেখে যায় শরীরেও। কবিতা হয়ে ওঠে দেহসঞ্চারিত অভিজ্ঞতার ভাষা। এ-প্রসঙ্গে বলা যায়, বাংলা কবিতায় এমন সরল অথচ জটিল দেহচর্চা খুব কম দেখা গেছে।

প্রেমের নতুন ব্যাকরণ

দেহপসরা-য় প্রেম একমাত্রিক নয়। এটি কখনো পার্থিব, কখনো অতিপার্থিব। কখনো তা স্পর্শে মুগ্ধ, আবার কখনো অনুপস্থিতির শূন্যতায় অন্যমনস্ক। প্রেমিকের প্রতি চাওয়া যেমন কামনাময়, তেমনি তা প্রার্থনাও বটে। এই দ্বৈত অনুভবই কবিতাগুলোকে করে তোলে বহুবর্ণ। প্রেমের এই জটিলতায় পাঠক বারবার থেমে ভাবতে বাধ্য হন—প্রেম কি কেবল আবেগ? না কি প্রেম এক ধরণের অস্তিত্বিক অনুসন্ধান?

শেলীর কবিতায় প্রেমিক সবসময় অনুপস্থিত থাকে না। অনেকসময় সে অদৃশ্য থেকেও সংবেদনের মাধ্যমে উপস্থিত থাকে। কবি প্রেমিককে ছুঁতে চান, আবার হারাতে ভয় পান। তিনি তার উপস্থিতি কামনা করেন, আবার চুপিচুপি তার চলে যাওয়ার সম্ভাবনাকেও ধারণ করেন। এই দ্বৈততা প্রেমের বাস্তব অভিঘাত। কবিতা এখানে কল্পনা নয়, বাস্তবের এক সংবেদনশীল পুনর্গঠন।

নারীসত্তা ও নিজস্বতার আত্মকথন

আমিনা শেলীর কবিতায় নারীর অবস্থান অনিশ্চিত নয়। তিনি একজন প্রেমিকা, একজন কামনার্ত, আবার একজন আত্মনিবেদিত সত্তাও। তবে এই প্রেমিকা অবদমিত নয়, বরং সে জানে কী চায়। সে নিজের দেহ নিয়ে লজ্জিত নয়, বরং তা নিয়ে গর্বিত, কৌতূহলী, আত্মসচেতন। তার অনুভবও পুরুষনির্ভর নয়; বরং নিজের অভ্যন্তরের সঙ্গে এক ধরনের সমঝোতার পথ রচনা করে সে। এখানে নারী হয়ে ওঠে একজন ‘আমি’, যিনি প্রেম চায়, প্রেম দেয়, আবার বিচ্ছেদের মুখোমুখিও হয়—কিন্তু কখনো নিজেকে হারায় না। এই আত্মনির্ভর নারীচেতনা দেহপসরা-কে নারী-কবিতার সীমা ছাড়িয়ে একটি সার্বজনীন অভিজ্ঞতার কবিতা করে তোলে।

ভাষা ও শৈলী: সরলতার গভীরতা

শেলীর কবিতা ভাষায় অনাড়ম্বর। কোথাও কোনো শব্দবাহুল্য নেই, নেই কাব্যিক অলংকারের অহেতুক মিছিল। কিন্তু এই ভাষার মধ্যেই রয়েছে গভীর প্রতীক, সূক্ষ্ম চিত্রকল্প, এবং সংবেদনের এক অনির্বচনীয় প্রবাহ।

এই যে পুরো একটি বইকে একটি মাত্র শব্দের ফ্রেমে বন্দি করে ফেলেছেন, অথচ একবারের জন্যও কোনো মেয়েলি ভঙ্গি কিংবা উপমার ব্যবহার আমার চোখে পড়েনি। তার লেখার বড় শক্তি হলো—তিনি কোনো মোড়ক বা আড়াল দিয়ে দেহ ও প্রেমের কথা বলেন না। তিনি সরাসরি বলেন, কিন্তু তাতে কোনো রুক্ষতা নেই। বরং পাঠক একধরনের আলোড়ন অনুভব করেন—যেমনটি অনুভূত হয় জীবনের বাস্তব অথচ অনুচ্চারিত সত্যগুলো সামনে এলে।

শেলীর রচনায় বারবার ফিরে আসে সময়, স্মৃতি, শরীর, ঈশ্বর ও অস্তিত্বের ইঙ্গিত। কখনো সময়ের ভ্রমর হয়ে দেহ থেকে বেরিয়ে আসে অভিজ্ঞতা; কখনো জানালার মতো খুলে যায় প্রেমিকের চোখ। এই প্রতীকগুলোর মধ্যে তিনি জীবন ও প্রেমকে জারিত করেন, তাতে ঘটে এক ধরনের অন্তর্গত বিস্ফারণ—যা পাঠককে কাঁপিয়ে দিয়ে যায়।

আধুনিকতা ও পারম্পর্যের সেতুবন্ধন

দেহপসরা গ্রন্থটি সময় সচেতন এক কাব্যগ্রন্থ। এখানে প্রেম ও দেহ নিয়ে আলাপ হয় না কেবল ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে, বরং সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটও তাতে অনুপুঙ্খভাবে মিশে থাকে। আজানের শব্দ, ঈমান, ত্বক, নামাজ, চুরি, হীরার দাগ—এসব শব্দ কেবল কাব্যিক সৌন্দর্য নয়, বরং একধরনের সাংস্কৃতিক বোধেরও প্রতিফলন।

এই কাব্যগ্রন্থ এক অর্থে নারীর মুক্ত উচ্চারণ, অন্য অর্থে সমাজের গোপন অভিজ্ঞতার উন্মোচন। কবি কোনো কিছুকে এড়িয়ে যান না। বরং স্পর্শ, যৌনতা, ভালোবাসা, বিশ্বাসঘাতকতা—সবকিছুকে কবিতায় স্থান দেন। এই সাহসী দৃষ্টিভঙ্গিই শেলীকে আলাদা করে তোলে।

বিষয় ও বিন্যাসের রচনাশৈলী

গ্রন্থটির কবিতাগুলো স্বল্প পরিসরে রচিত—তবে তাতে কোনো ভাবঘনত্বের ঘাটতি নেই। প্রতিটি কবিতা এককভাবে দাঁড়াতে সক্ষম হলেও, গ্রন্থজুড়ে এক অন্তঃপ্রবাহ রয়েছে—যা সমস্ত কবিতাকে একটি সংহত অভিজ্ঞতায় রূপ দেয়। পাঠকের মনে হয়—এ যেন একটি দেহের দিনলিপি, কিংবা এক প্রেমিকার অন্তর্জগতের বর্ণমালা।

এই বিন্যাসে কোনো নাটকীয় পরিবর্তন নেই, নেই কোনো অপ্রয়োজনীয় দার্শনিক জটিলতা। শেলী প্রত্যক্ষ ও অনুশীলিত অভিজ্ঞতা থেকে কবিতা নির্মাণ করেছেন। ফলে কবিতাগুলো পাঠকের কাছে ধরা দেয় সহজে, কিন্তু পড়ে গেলে আর সহজ থাকে না। প্রতিটি পঙ্‌ক্তির পর পঙ্‌ক্তি যেন এক পরের স্তর উন্মোচন করে—যেখানে আছে প্রেম, অস্থিরতা, ক্লান্তি, কামনা, নৈঃশব্দ্য এবং মৃত্যুচেতনা।

শরীর ও ঈশ্বর: দ্বৈত অথচ মিলিত অভিজ্ঞতা

একটি অনন্য দিক হলো—শেলীর কবিতায় দেহ ও ঈশ্বর কখনো একে অপরের বিপরীতে থাকে না। বরং দেহেই যেন ঈশ্বরের অবস্থান। ঈমান, নামাজ, আজান—এসব শব্দ যখন প্রেম ও দেহের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবহৃত হয়, তখন তা কেবল সাহসিকতার বহিঃপ্রকাশ নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক দেহানুভূতির প্রকাশও।

এই দৃষ্টিভঙ্গি সুফি কাব্যের এক অনুরণন বহন করে। যেমন সুফিরা দেহ ও প্রেমের মধ্য দিয়েই আল্লাহর সঙ্গে মিলনের স্বপ্ন দেখতেন, শেলীর কবিতায় দেহ হয়ে ওঠে এমন এক মাধ্যম, যা দিয়ে প্রেমিকের মাঝে ঈশ্বর অনুভব করা যায়, আবার ঈশ্বরের উপস্থিতিতে প্রেমিকের অভাবও টের পাওয়া যায়।

‘দেহ’ এবং ‘ভালোবাসা’র নতুন উচ্চারণ

দেহপসরা কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ নয়—এটি এক আত্মিক অন্বেষণ। দেহ ও প্রেম নিয়ে সাহসিকতার সঙ্গে, আবার অনুভবের গভীরতায় শেলী যে কাব্যিক নির্মাণ করেছেন, তা আমাদের বর্তমান কবিতার ভাণ্ডারে এক শক্তিশালী সংযোজন।

এই বই আমাদের বারবার ভাবতে বাধ্য করে—দেহ কি কেবল প্রেমের বাহক, নাকি প্রেম নিজেই এক ধরনের দেহরূপ? প্রেম কি কেবল মনের? না কি দেহও ভালোবাসে, চায়, আকাঙ্ক্ষা করে?

শেলীর ভাষায়, “দেহটাই ভালোবাসে মূলত / বাকি সব ঢং”—এই স্বীকারোক্তিই যেন তাঁর কবিতার সারাংশ।

বাংলা কবিতায় যে প্রেম দীর্ঘদিন ধরে আধ্যাত্মিক বা রোমান্টিক ফ্রেমে আটকে ছিল, শেলী তা ভেঙে দেহের নিজস্ব ব্যাকরণে পুনর্নির্মাণ করেছেন। তার কবিতা নারীজীবনের, প্রেমিকার, প্রাপ্ত ও অপ্রাপ্ত প্রেমের, দেহের, কামনার এবং পরিশেষে অস্তিত্বের এক নতুন পাঠ তৈরি করে।

দেহপসরা আমাদের শেখায়, দেহের মধ্যেও আত্মা থাকে—আর প্রেম, সেটি দেহ দিয়েই অনুভবযোগ্য।

রকমারি থেকে বইটি কিনতে এখানে ক্লিক করুন

আতিকুর ফরায়েজী
আতিকুর ফরায়েজী। জন্ম ১৯৯১ খ্রিস্টাব্দে। চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলার নওদাবন্ডবিল গ্রামে তার জন্ম। তিনি একজন তরুণ কথাসাহিত্যিক, কবি এবং গীতিকার। তার প্রকাশিত বই: অতল জলের গভীরতা (কবিতা, ২০২৫ বইমেলা, পয়স্তি প্রকাশন)
বার পড়া হয়েছে
প্রকাশিত :
মে ১৪, ২০২৫
শেয়ার :
পয়স্তিতে যারা লিখেছেননির্দেশিকাশর্তাবলী
১০ দিনে জনপ্রিয় লেখক
magnifiercrossmenu