স্যার ,স্যার বলে চিৎকার...
মুখ তুলতেই দেখি তুলি; হঠাৎ কেউ যদি দূর থেকে এভাবে চিৎকার দেয় স্বাভাবিকভাবে ধাক্কা লাগে। ফলে ক্লাসের মাঝখানে বিরক্তি, রাগ ছুঁয়ে যায়। পর-পর দুটি ক্লাস; তাও আবার কোনো ছাত্রীর এমন আচরণ।
রেগে কিছু বলার আগে তুলি বলল, স্যার না বলে কয়ে ঢুকে পড়লাম। রাস্তায় যা অবছা। ঠিকমতো গাড়ি পায় না, তার উপর জ্যাম। আরো বড় সমস্যা বড় রাস্তাগুলো ভয়ে এপার থেকে ওপারে পাড়ি দিতে পারি না। ১০ টাকা দিয়ে রিকশায় চড়ে রাস্তা পাড় হই। আমাদের ড্রাইভারের কারণেই এতো সব ঝক্কি ঝামেলা ।
কথার সঙ্গে ওর চঞ্চল চোখ দুটোর উঠানামা দেখলেই রাগটা হজম হয়ে যায়। একটা দিনও মেয়েটি ক্লাস ফাঁকি দেয় না। খুবই মনোযোগী, দেরিতে আসা একটু স্বভাব আর যত বাহানা। ক্লাস শেষ হলে কি আর স্বস্তি পায়? নিধন বাবুর যন্ত্রণাদায়ক কথা বার্তা শুরু হয়।
উকিল বাবু ব্যস্ত নাকি?
কিছু বলবেন?
এই মানে কথা ছিল;
সরকারি চাকুরি হলে দিব্যি আড্ডার ঝুড়ি নিয়ে বসা যায়। এক্সট্রা শিক্ষকতার দরকার ছিল না। কিন্তু প্রাইভেটে নানান ঝাপটা সামলাতে হয়।
বললাম,একটু অপেক্ষা কর“ন;ছাত্রদের বিদায় করি।
পান চিবুতে-চিবুতে সাঁই দিয়ে বেঞ্চে গিয়ে বসলেন নিধন বাবু।
চাইলেই ছাত্রদের সামনে কথা সেরে ফেলতে পারতাম। কিন্তু উনি আবার অল্প কথার লোক না। এলোমেলো কথা বেশি বলেন । টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া পর্যন্ত। তখন কান বন্ধ করার উপক্রম হয়। বীণা ম্যাডাম আজ কেমন ব্লাউজ পড়ে এসেছেন গলাটা বেশি নিচে নেমে গেছে, কোন বয়সে কি পড়া দরকার, এভাবে ঘোমটা দিলে কি হয়, ওভাবে দিলে কেমন হয়। ছাত্রীদের নিয়েও তার যত কথা। এসব আমার একদম পছন্দ না। ভদ্রতার খাতিরে সহ্য করা।
সময়মতো নিধন বাবুকে সামনে এসে বসতে বললাম।
মুখের ভিতরের আবর্জনাগুলো ফেলে ভূড়িটা সামনে এগিয়ে দিয়ে, পা ছড়িয়ে বসলেন।
বলুন কী ব্যাপার? চুপ করে রইলেন। সবসময় যা করেন। একটু গলা পরিষ্কার করলেন। কাশিটা প্রতিবারে ভদ্রতার লক্ষণ মনে হয়।
যথাসময়ে নিধনবাবু বললেন, নাম মিথু, বয়স ৩২, তোমার বুক সমান হবে। দিনদিন ভালবাসা বাড়ছে। যখন তখন বারান্দায় উঁকি দেয়। ও রাজী কিন্তু ভয় পাচ্ছে।
আমি বললাম, বুঝলাম না নিধন বাবু কি বলছেন?
ইয়ে মানে, আসলে আপনি রাজী কিনা?
আপনার তো কেউ নেই; একটা মাত্র মেয়ে। মিথু সব গুছিয়ে নিতে পারবে, একেবারে পরিচ্ছন্ন একটা মেয়ে।
হঠাৎ আমার আকাশে বিদ্যুৎ চমকালো। সেই বিদ্যুৎ গায়ের উপর এসে পড়লো।
হাসান সাহেব অবাক, মিথিলা, ফরসা চেহেরা । একত্রিশ কি বত্রিশ। আমার পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। বাপ, মেয়ে দুজনের সংসার। মেয়ে স্কুলের টিচার। কিন্তু সে কখন, কোন সময় তার চলমান জীবন যাপনে আমার জন্য জায়গা তৈরি করে নিল টেরই পেলাম না। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করছি নিধন বাবুর কথার ডায়রি থেকে সরে আসতে। তাছাড়া এতসব কথা ভাবার মতো বাড়তি সময়ও আমার নেই। মনে মনে রাগ হোল । মেয়েটি আচ্ছা বোকাতো, নিধনবাবুকে দিয়ে সম্বন্ধ পাঠিয়ে দিলেন। অথবা মেয়েটি পাঠায়নি নিধন বাবু হয়ত নিজেই লবণ ছিটাতে এসেছেন। মিথুর কথা ভাবতে ভাবতে হাসান সাহেবের মনে পড়ে গেলো মিলির কথা।
কি গো আজ তো বাইরে খাওয়ার কথা। চার বছর ভালবাসা পার করে দিলাম। পঞ্চম বিবাহ বার্ষিকী আমাদের। আজকে একটু অফিস থেকে তাড়াতাড়ি এসো।
সেই কখন থেকে মা-মেয়ে তৈরি।
বললাম, একটা কাজ করো আমি সোজা রেস্টুরেন্ট চলে যাচ্ছি তুমি মেয়েকে নিয়ে চলে এসো।
ফোনটা রেখে অপেক্ষা; কিন্তু সেই অপেক্ষা শেষ হোল অন্যভাবে। মিলি জ্যান্ত রক্ষা পেলো না। মিলির জীবন প্রদীপ নিভে গেলো। একটি চারচাকা আমার সাজানো বাগানটি পিষে তছনছ করে দিলো। চোখের সামনে রাস্তাটি ভয়ানক হয়ে উঠলো। অনেক দিন পাগল প্রায়। মেয়েটির জন্য সুস্থ জীবনে ফিরে আসা। জানি সে আমার ভেতরে তার মায়ের ছবি খুঁজে বেড়ায় অহর্নিশি। বাকি পথটুকু ওকে গড়ার পিছনে কাটিয়ে দিবো। আমার ভুলের কারণেই ও আজ মা হারা। এই ভুলের ক্ষমা নেই। ওর উপর কোনো ঝড় যেতে দিবো না আর। নিধন বাবুকে বেশি কথা বলার সুযোগ না দিয়ে বাসায় ফিরে আসলাম। বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাইরের দৃশ্য দেখছিলাম। বৃষ্টির নাচা নাচি থামতেই চায় না। অসহ্য গরমে হঠাৎ বৃষ্টি ভালোই লাগে। বৃষ্টি দেখলে মনে পড়ে বৃষ্টি ভেজা তুলির দৌড়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লাসে ঠোকা। পিছন থেকে নিয়ে আসা কাঁধের এক পাশে বেনীর কথা। কপাল কুঁচকে মুখে ভেংচি কেটে বৃষ্টিকে তাচ্ছিল্য করা। আর মনে মনে হেসে উঠি ওর চঞ্চল কথাগুলো শুনে। টোল পরা গালে মিষ্টি হেসে বান্ধবীদের ফিস ফিস করে বলতে, আজকে সাদা শার্ট পড়ায় স্যারকে অন্যরকম লাগছে।
ভালোই লাগে শুনতে। বার বার উঁকি দেয় সে আমার ভিতর। ওর সাথে আমার বয়সের ব্যবধান অনেক। বুঝি আমাকে ঘিরে তার দুর্বলতা, নিজেকে উপস্থাপন করার ধরনও। আমারও যে ভাল লাগে না তা না। কিন্তু আমার স্বার্থের জন্য তার জীবনটাকে ২য় করে ফেলতে চায়না। ফুটফুটে একটা বা”চা মেয়ে । খুব ভালো পরিবারের মেয়ে। কথা বলা উচিত তুলির সঙ্গে। ওর ভুল ভাঙাতেই হবে। নইলে পরে ও আরও কষ্ট পাবে । আমার জীবনে তুলি,মিথু কারো আগমন সম্ভব না। আমি মিলির জায়গা দিতে পারবো না। মিথু তো প্রশ্নই উঠে না। মিথুকে নিধন বাবুর মাধ্যমে সামলানো যাবে। কিন্তু তুলির সাথে সরাসরি কথা বলতে হবে। ক্লাশ শেষে সবাই যখন পড়া বুঝিয়ে নিতে আসে তখন তুলিও শামিল থাকে। তখনই ওর সাথে কথা বলতে হবে। সুযোগের অপেক্ষায়। তিন,চার দিন পর তুলিকে একা পেয়ে অনেক সাহস নিয়ে ওর মনটা ভাঙ্গতে হাতুড়ি নিলাম বললাম, তুলি জীবনটাকে নিয়ে খেলো না , এটা খেলার জিনিস না। জীবন কতটা নিষ্ঠুর হতে পারে তুমি এখনও দেখনি। আমি এর মাঝে বেঁচে আছি, বেঁচে থাকার চেষ্টা করছি। মনে করতে চায় সব কিছু অনেক সুন্দর, আনন্দের। কিন্তু ইদানীং বেশিক্ষণ পারি না। ক্লান্ত লাগে, দয়া করো আমাকে। তুমি যা ভাবছো তা কখনোই হওয়ার নয়। মাফ করো আমাকে।
তুলির চোখ চিকচিক করছে। উচ্ছ্বসিত চোখ দুটোতে সাগরের ঢেউ আসছে আর যাচ্ছে। ঢেউ আসলেও এতে তারই মঙ্গল। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো আমার দিকে তুলি। হয়ত ভাবছে কত পাষাণ মানুষটা। মনে মনে বললাম তুমি যায় ভাবো না কেনো তুলি,আমি কিন্তু আজ অনেক হালকা হলাম। স্বস্তি পেলাম।
সপ্তাহ খানেক পাড় হোল। কোর্ট থেকে বাসায় ফিরছিলাম, গরমটা মাটি ফাটা, গাড়ির এসিটাও কাজ করছে না। জানালাটা খুলে দিলাম। কিন্তু বাইরে তাকাতেই যা দেখলাম অবিশ্বাসস্য। রীতিমতো যুদ্ধ, আর সেই যুদ্ধের সৈনিক তুলি। বাসের জন্য লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে। এসব কি? তার মানে তুলি? উফ আমার নিজেরই খুব লজ্জা লাগছে। ওর এত মিথ্যে বলার দরকার কী ছিল? মুহূর্তে তুলি কোথায় হারিয়ে গেলো। না সব জানতে হবে। কেন এতো আয়োজন করে কথা বলা?বাসে চড়ার অভ্যাস নেই। কি দরকার এতো মিথ্যে বলার। আমাদের যা আছে তা নিয়েই সন্তুষ্ট থাকা উচিত। তাতেই আমাদের আত্মসম্মান বাড়ে। মাথা উঁচু থাকে। তাকে বোঝাতে হবে। মিথ্যের উপর কিছুই ঠিকে না। অনেক বিশ্বাস করতাম মেয়েটিকে। সারাদিন ওর কথা ভেবে ভেবে রাত পাড় করলাম। আজ সূর্যটা ঘুমিয়ে আছে । পরিবেশটা ভ্যাপসা। কিছু ভালো লাগছে না। ক্লাসে যেতে হবে। আজ তো অবশ্যই যাওয়া দরকার। যথারীতি তৈরি হয়ে ক্লাসের উদ্দেশে রওনা দিলাম। ক্লাসে গিয়ে দেখি তুলি আজ তাড়াতাড়ি ক্লাসে হাজির। আজ ওকে আগের মতো উচ্ছ্বসিত, হাসি খুশি দেখলাম না। ভীত সন্ত্রস্ত। পরীক্ষার হলে নকলে ধরা পড়লে যেমন হয় তেমন। ক্লাস শেষে তুলিকে দাঁড়াতে বললাম, কিন্তু দাঁড়ালো না। আমি খুব তড়িঘড়ি করে তার পিছু নিলাম। তার গন্তব্য পর্যন্ত । কিন্তু একি কাণ্ড । সহজেই অঙ্ক মিলাতে দেরি হলো না। আমি একদম জড় পদার্থ হয়ে রইলাম। মেয়েটি এতোগুলো নরপিশাচদের দখলে। কী বলবো, কী করবো ,আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসলো। প্রতিদিন, প্রতিরাত ওর আত্মসম্মান, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বলি হয়। ভাবতেই গা শিরশির করছে। তার বের হওয়ার সকল রাস্তা আগুনে সাজানো। যেদিকে যাবে ছাই হবে।
কেন তুলি?তোমার এই সমস্যার কথাটা আমাকে অন্তত ভাগ করতে পারতে?পাগল আমি কি বলছি। এই যন্ত্রণা কি পছন্দের মানুষকে বলা যায়?ওর জীবন নিয়ে ও কি খেলবে?ওর জীবনতো ওর নিয়ন্ত্রণেই নেই। খেলছে অন্য দশজন। আমি নিজের সাথে কথা বলতে বলতে স্থানটি ত্যাগ করলাম। সেই দিনের পর থেকে তুলিকে আর দেখা গেল না। হয়ত জানতে পেরেছে। লজ্জার উপর কারো নিয়ন্ত্রণ নেই,দখলও নেই। কিন্তু আমার ভিতরটা সে ঠিকই দখল করে নিয়েছে পরম শ্রদ্ধায়...
(©) শাম্মী তুলতুল

